মাত্র দুই বছর আগে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ খরার মুখে পড়েছিল পানামা খাল। জাহাজ পারাপারের জন্য কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে তখন। এমনকি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাল পার হওয়ার সুযোগ পেতে নিলামে লাখ লাখ ডলার পর্যন্ত খরচ করতে হয়েছে কোনো কোনো জাহাজকে। এর মধ্যে আবহওয়ার চক্র বদলে যাওয়ায় আবার চাপে পড়েছে জাহাজ চলাচল।
প্রকৃতির চক্রে এখন এল নিনোর সময়। এল নিনো শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খালের পানি কমছে। ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে আবারও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটবে—এমন আশঙ্কা করছে জাহাজ চলাচল ও বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট শিল্প। খবর রয়টার্সের
ইতিমধ্যে কিছু জাহাজ আফ্রিকা ঘুরে গন্তব্যে যাচ্ছে। একদিকে হরমুজ প্রণালিতে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, আরেক দিকে এল নিনোর কারণে পানামা খালে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা। এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববাণিজ্য বড় ধরনের হুমকিতে পড়তে পারে।
বৃহস্পতিবার পানামা খাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা আগে জাহাজ চলাচলে সীমা আরোপ না করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা থেকে সরে এসেছে। স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এল নিনোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।
.১. খালে পানি আসে কোথা থেকে
পানামা খাল পরিচালনায় মিঠাপানির প্রয়োজন হয়, এটি ঠিক মিসরের সুয়েজ খালের মতো নয়। প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যে জাহাজ চলাচলের জন্য ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ কৃত্রিম এই জলপথে তিনটি জলকপাট আছে।
খালের পানি সরবরাহ মূলত দুটি কৃত্রিম জলাধারের ওপর নির্ভরশীল—গাতুন ও আলাহুয়েলা হ্রদ। কোনো জাহাজ যখন এই খাল পার হয়, তখন এসব জলাধার থেকে লাখ লাখ লিটার পানি ছাড়তে হয়। মাধ্যাকর্ষণনির্ভর শতবর্ষী জলকপাটব্যবস্থার মাধ্যমে এই পানি ব্যবহার করে জাহাজ ওপরে তোলা ও নিচে নামানো হয়।
.২. পানামা খালের জন্য এল নিনো কেন গুরুত্বপূর্ণ
এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া। এটি একধরনের প্রাকৃতিক চক্র। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এবার যে এল নিনো শুরু হয়েছে, তার প্রভাবে ২০২৭ সাল হতে পারে বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণ বছর।
প্রশান্ত মহাসাগরের অনেক দূরের অঞ্চলের পানির তাপমাত্রা বেড়ে গেলেও পানামার বৃষ্টির ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে। যে বায়ু পানামায় বৃষ্টি নিয়ে আসে, এল নিনোর কারণে তা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এতে জলাধারগুলোতে পানির সরবরাহ কমে যায়।
নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির পুরকৌশল ও পরিবেশ প্রকৌশলের সহযোগী অধ্যাপক স্যামুয়েল মুনোজ বলেন, জলাধারের পানির স্তর কমে গেলে পানি সংরক্ষণের জন্য খাল কর্তৃপক্ষ জাহাজ চলাচলের সংখ্যা কমাতে বাধ্য হয়। ফলে যে পরিবহন বিঘ্ন তৈরি হয়, তার প্রভাব পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে।
৩. পানির উৎসগুলো ঝুঁকিতে কেন
গত মে মাস থেকে পানামায় রেকর্ড তাপমাত্রা দেখা যাচ্ছে। স্মিথসোনিয়ান ট্রপিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্কে এ তথ্য উঠে এসেছে। মে, জুন ও জুলাই—তিন মাসেই মাসিক গড় তাপমাত্রা রেকর্ড বা রেকর্ডের কাছাকাছি ছিল।
একই সময়ে পানামার বেশির ভাগ এলাকায় স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম বৃষ্টি হয়েছে বলে জানান পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্কের প্রধান স্টিভেন প্যাটন। বিশেষ করে খালের আশপাশের কিছু এলাকায় বৃষ্টির পরিমাণ রেকর্ড বা রেকর্ডের কাছাকাছি পরিমাণ কমে গেছে।
.পানামা খাল কর্তৃপক্ষ কী করছে
এল নিনোর কারণে পানির স্তর কমে যাওয়ার আশঙ্কায় পানামা খাল কর্তৃপক্ষ আগামী ৪ সেপ্টেম্বর থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩৪টি জাহাজ পারাপারের অনুমতি দেবে। এরপর ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে তা কমিয়ে ৩২টি করা হবে।
তবে এল নিনো দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে পানির স্তর আরও কমতে পারে—এমন পূর্বাভাস আছে। সে ক্ষেত্রে জাহাজ চলাচলের সীমা আরও কমিয়ে দিতে পারে কর্তৃপক্ষ।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এবারের পরিস্থিতি ২০২৩-২৪ সালের খরার বিষয়টি মনে করিয়ে দিচ্ছে। সরকারি তথ্যে জানা যায়, ওই সময় পানির সংকটে খাল দিয়ে প্রতিদিন জাহাজ চলাচল কমিয়ে ২২টি করা হয়েছিল।
২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত পানামা খালে প্রতিদিন ৩৪ থেকে ৩৫টি জাহাজ চলাচল করেছে।
এতে জাহাজ চলাচলে কী প্রভাব পড়ছে
পানামা খাল দিয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পার হওয়ার সুযোগ পেতে প্রতিটি ট্যাংকারকে ৪০ লাখ ডলারের বেশি** দিতে হয়েছে। এমন খবর প্রকাশের পর খাল কর্তৃপক্ষ বিস্তারিত না জানিয়ে স্বীকার করেছে, সম্প্রতি কিছু জাহাজ বাণিজ্যিক প্রয়োজন মেটাতে নিলামে ১০ লাখ ডলারের বেশি** অর্থ দিয়েছে।
অর্থাৎ খাল দিয়ে দ্রুত পার হওয়ার সুযোগ পেতে জাহাজ পরিচালনাকারীদের বিপুল পরিমাণে বাড়তি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে।
.বিকল্প পথ কী
বহুজাতিক গবেষণা সংস্থা ভর্টেক্সার জ্যেষ্ঠ তেলবাজার বিশ্লেষক রোহিত রাঠোর বলেন, দীর্ঘমেয়াদি ট্রানজিট স্লট বুকিং বা নিলামে বিপুল অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা না থাকায় অনেক জাহাজ এখন আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথে যাচ্ছে।
রাঠোরের মতে, চলতি আগস্টে এখন পর্যন্ত এশিয়াগামী গ্যাসবাহী জাহাজের প্রায় অর্ধেকই পানামা খালের পরিবর্তে কেপ অব গুড হোপ হয়ে যাচ্ছে। গত এক দশকে এ হার সর্বোচ্চ।
তবে এর জন্য সময় অনেক বেশি লাগছে। হিউস্টন থেকে জাপানগামী বড় গ্যাসবাহী ট্যাংকার পানামা খাল হয়ে গেলে প্রায় ২৬ দিন লাগে। কিন্তু উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে যেতে সময় লাগে প্রায় ৪৫ দিন।
অর্থাৎ বিকল্প পথে যেতে হলে জাহাজের প্রায় তিন সপ্তাহ বেশি সময় লাগছে। এর সঙ্গে বাড়ে জ্বালানি ও পরিচালন ব্যয়।
.দীর্ঘ মেয়াদে কী সমাধান খোঁজা হচ্ছে
দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে পানামা কর্তৃপক্ষ রিও ইন্দিওতে নতুন জলাধার নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনা করছে।
পানামা খাল কর্তৃপক্ষের দাবি, নতুন এই জলাধার নির্মিত হলে দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষের পাশাপাশি খালের কার্যক্রমের জন্যও আগামী ৫০ বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব। একই সঙ্গে আশপাশের জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা যাবে।
তবে পরিবেশবাদীরা এই জলাধার নির্মাণের বিরোধিতা করছেন। তাঁদের কেউ কেউ মনে করেন, নতুন জলাধারের প্রয়োজন নেই। এর পরিবর্তে বায়ানো হ্রদের মতো বিদ্যমান পানির উৎস ব্যবহার করা যেতে পারে, অর্থাৎ বিকল্প ব্যবস্থার সন্ধান দিয়েছেন তাঁরা।
.আগের এল নিনোর তুলনায় এবারের পরিস্থিতি কেমন
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের জলবায়ু পূর্বাভাস কেন্দ্র গত সপ্তাহে প্রকাশিত পূর্বাভাসে জানিয়েছে, এল নিনো শক্তিশালী হচ্ছে। ২০২৬ সালের উত্তর গোলার্ধের শরৎ ও শীত মৌসুমে খুব শক্তিশালী এল নিনো হওয়ার আশঙ্কা ৯০ শতাংশের বেশি।
ক্লার্কসন্স সিকিউরিটিজ চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও জাহাজ চলাচলের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার মধ্যে এল নিনো জাহাজ চলাচলের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে।
ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে পানামা খালে পানির সংকট—দুই দিক থেকেই পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।