রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) নির্বাচন এখনও তপশিলের গণ্ডিতে ঢোকেনি, ভোটের দিন-তারিখও অজানা। অথচ মেয়র পদ ঘিরে এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে হিসাব-নিকাশ। কে হবেন দলীয় প্রার্থী, কার ওপর ভরসা রাখবে দল, আর শেষ পর্যন্ত কার পক্ষে যাবে ভোটের মাঠের সমীকরণ—এসব প্রশ্নে সরগরম বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভেতর-বাহির।

রাসিক নির্বাচনের সম্ভাব্য মাঠে তিনটি রাজনৈতিক শক্তির অবস্থান দৃশ্যমান—বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি। জামায়াত ইতোমধ্যে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। এনসিপিও সম্ভাব্য প্রার্থী সামনে এনেছে। অন্যদিকে বিএনপিতে একাধিক নাম আলোচনায় থাকলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক তপশিল ঘোষণার আগেই সম্ভাব্য প্রার্থীদের ঘিরে নগরজুড়ে শুরু হয়েছে ভোটের আলোচনা ও রাজনৈতিক সমীকরণ।

জামায়াতের প্রার্থী ডা. জাহাঙ্গীর

রাসিক নির্বাচনের সম্ভাব্য লড়াইয়ে নতুন মাত্রা যোগ করেছে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ঘোষণা। গত ১১ আগস্ট দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সভায় রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীরকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

চিকিৎসক হিসেবে পেশাগত পরিচয়ের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ডা. জাহাঙ্গীর বর্তমানে রাজশাহী মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমিরের দায়িত্ব পালন করছেন।

সবশেষ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি রাজশাহী-২ (সদর) আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মিজানুর রহমান মিনুর কাছে তিনি পরাজিত হন। মিনু ১ লাখ ২৮ হাজার ৫৪৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন। ডা. জাহাঙ্গীর পান ১ লাখ ৩৭০ ভোট। ভোটের ব্যবধান ছিল ২৮ হাজার ১৭৬।

সিটি নির্বাচন নিয়ে ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর বলেন, এখনও প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়নি। তবে জনগণের সঙ্গে সর্বক্ষণিক যোগাযোগ হচ্ছে। আমরা মানুষের মনের ভাষা বোঝার চেষ্টা করছি। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আমরা জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী।

বিএনপিতে একাধিক নাম

রাসিক নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়েই নগর রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে। মহানগর বিএনপির একাধিক নেতার নাম মেয়র পদে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় এসেছে।

আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন বর্তমান রাসিক প্রশাসক ও রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন। প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নগরীর নাগরিক সেবা, পরিচ্ছন্নতা, রাজস্ব আদায়সহ বিভিন্ন বিষয়ে তার তৎপরতা তাকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রেখেছে।

এ ছাড়া রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুনের নামও সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে। তবে দলটির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে চূড়ান্ত করা হয়নি।

রাসিক নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রশাসক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, দল মনোনয়ন দিলে নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে কাজ করব। প্রশাসক হিসেবে যা কাজ করছি, তার চেয়েও বেশি কাজ করার চেষ্টা করব।

অন্যদিকে মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুনুর রশিদ মামুন বলেন, দল যদি আমাকে মূল্যায়ন করে, তাহলে ইনশাআল্লাহ আমি নির্বাচন করব। অতীতেও মানুষের জন্য কাজ করেছি। সব সময় মানুষের পাশে থেকে কাজ করতে চাই।

বিএনপির নেতাদের বক্তব্য, শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্তই মনোনয়নের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত হবে। ফলে তফসিল ও দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু হলে বিএনপির অবস্থান আরও স্পষ্ট হতে পারে।

এনসিপির প্রার্থী মোবাশ্বের আলী

রাসিক নির্বাচনকে সামনে রেখে জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে। দলটির রাজশাহী মহানগর আহ্বায়ক মোবাশ্বের আলীকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে সামনে আনা হয়েছে।

২০২৬ সালের মার্চে পাঁচটি সিটি করপোরেশনের জন্য সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে এনসিপি। সেখানে রাজশাহীর জন্য মোবাশ্বের আলীর নাম ছিল। পরবর্তী সময়ে রাজশাহীতে আয়োজিত বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতেও তাকে রাসিক নির্বাচনের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।

মোবাশ্বের আলী বলেন, জোটগতভাবে মেয়র প্রার্থী হিসেবে আলাদাভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। তবে এখনো জোটগতভাবে একক প্রার্থী দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়নি। তফসিল ঘোষণা না হলেও জনসম্পৃক্ততা ও প্রচার-প্রচারণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।

স্থানীয় ইস্যুই হতে পারে বড় ফ্যাক্টর

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সিটি করপোরেশন নির্বাচন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তুলনায় অনেক বেশি স্থানীয় ইস্যুনির্ভর। নগরীর সড়ক, যানজট, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেনেজ, পানি সরবরাহ, খেলার মাঠ, পার্ক, নাগরিক সেবা ও নগর উন্নয়ন—এসব বিষয় ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, জনসম্পৃক্ততা, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং নাগরিক সমস্যা সমাধানের পরিকল্পনাও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুব্রত কুমার পাল জানান, প্রার্থীর সক্ষমতা ও ইমেজ এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, জনগণকে যদি ভোট দেওয়ার সুযোগটা দেওয়া হয়, তাহলে তারা যথাযথভাবে সঠিক প্রার্থী নির্বাচন করতে ভুল করবে না।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) নির্বাচনে সর্বশেষ প্রকাশিত ভোটার তালিকা অনুযায়ী মোট ভোটার ৩ লাখ ৫১ হাজার ৯৮২ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭১ হাজার ১৬৭ জন, নারী ভোটার ১ লাখ ৮০ হাজার ৮০ ৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ছিল ৬ জন।