‘জেলে থাকতি দুবেলা খাওন পাইতাম, এখন অনেক সময় না খাইয়া থাকতি হয়। জেল থেকে মুক্তি পাইছি, কিন্তু জীবন পাই নাই।’— দীর্ঘ ২১ বছর কারাবাসের পর মুক্ত জীবনে ফিরে নিজের অসহায়ত্বের কথা জানালেন বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার বাসিন্দা ইব্রাহিম আলী শেখ।
২০০৩ সালে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে দুই দশকের বেশি সময় কারাগার কাটিয়ে গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পান তিনি। তবে এই দীর্ঘ সময়ে হারিয়েছেন তার যৌবন, সংসার এবং স্ত্রী-সন্তানের সান্নিধ্য। বর্তমানে তিনি তার বৃদ্ধ মাকে নিয়ে দরিদ্র ভগ্নিপতির ঘরের এক কোণে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন।
ফকিরহাট উপজেলার মরা পশুর নদীর চরের খাসজমিতে অবস্থিত ভগ্নিপতির বাড়িতে ইব্রাহিমের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, ২০০৩ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হন তিনি। একই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে চারটি মামলা করা হয়। দরিদ্র হওয়ায় আইনজীবী নিয়োগের সামর্থ্য ছিল না তার। ফলে বিভিন্ন মামলায় মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবনের সাজা পান তিনি।
পরবর্তীতে কারাগারে থাকা এক কয়েদির পরিবারের সহায়তায় উচ্চ আদালতে আপিল করেন ইব্রাহিম। ২০১৭ সালে হত্যা ও যাবজ্জীবন মামলায় খালাস পেলেও আদালতের আদেশ কারাগারে পৌঁছায়নি। ফলে খালাসের পর আরও প্রায় আট বছর তাকে কারাগারে কাটাতে হয়। অবশেষে ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান তিনি।
ইব্রাহিম বলেন, “গ্রেপ্তারের সময় ছেলের বয়স ছিল মাত্র দুই মাস। সেই সন্তান এখন বড় হয়ে বিয়ে করেছেন। এরই মধ্যে স্ত্রীও ছেড়ে চলে গেছেন। আমার অনুপস্থিতিতে বৃদ্ধ মা-ই মেয়েকে বড় করেছেন। কিন্তু বাবার ‘আসামি’ পরিচয় মেয়ের জীবনেও ছায়া ফেলেছে। বড় হওয়ার পর ভালো কোনো পরিবার বিয়ের জন্য এগিয়ে আসেনি। সবাই বলত, বাপ খুনি, মা চলে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, “জেলে থাকতেই শুনছিলাম, বাধ্য হয়ে আমার মা মেয়েকে একটা অতি দরিদ্র পরিবারে বিয়ে দিয়েছে। মুক্তির পর এসে দেখি, মেয়েও অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। জেলে জীবন শেষ করা একজন অক্ষম বাবা হয়ে মেয়ের এই কষ্ট দেখা মৃত্যুর চেয়েও ভারী।”
কারাগারে যাওয়ার আগে রিকশা চালিয়ে ও নাইটগার্ডের কাজ করে পরিবারের ভরণপোষণ করতেন ইব্রাহিম। কিন্তু দীর্ঘ সময় কনডেম সেলের অন্ধকারে থাকার ফলে তার দৃষ্টিশক্তি কমে গেছে এবং শরীর দুর্বল হয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, “মানুষ কাজ দিতেও চায় না, কাজ করার শক্তিও নাই। নিয়মিত কোনো আয় নাই। অনেক সময় বৃদ্ধ মাকে নিয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে থাকতে হয়। দরিদ্র ভগ্নিপতির পরিবারও আর কতদিন আমাদের চালাবে? গরিব আছিলাম, তাই নিজেরে বাঁচাইতে পারি নাই। মিথ্যা মামলায় ২১ বছর জেল খাটলাম। তার মধ্যে খালাস পাওয়ার পরও আটটা বছর ফাও জেলে থাকলাম। এখন সরকারের কাছে চাই—আমারে বাঁচার একটা ব্যবস্থা করে দিক।”
ইব্রাহিমের বৃদ্ধ মা কোহিনূর বেগম জানান, ছেলেকে মুক্ত করতে তিনি ইটভাটায় কাজ করেছেন এবং বটিয়াঘাটায় নিজের ঘরটি বিক্রি করে দিয়েছেন। বর্তমানে জামাইবাড়িতে থাকলেও ছেলের শারীরিক দুর্বলতার কারণে তারা চরম সংকটে আছেন।
এই বিষয়ে বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, “ইব্রাহিম আলী শেখের চাহিদা ও সক্ষমতা অনুযায়ী কাজের ব্যবস্থা করা হবে। ফকিরহাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তাকে তার কাছে পাঠিয়ে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। সরকারের যে সক্ষমতা রয়েছে, তার মধ্য থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। পাশাপাশি আমাদের বিত্তবান মানুষের কাছেও আবেদন জানাব—তারা যদি মানবিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন, তাহলে ইব্রাহিমকে একটি সুন্দর জীবন দেওয়া সম্ভব হবে। তিনি যাতে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারেন, সে উদ্যোগ নেওয়া হবে।”