আধিপত্য বিস্তার ও ভিডিও কলে সহযোগীকে হত্যার দৃশ্য দেখার জেরে খুলনার লবণচরায় ঘটে যাওয়া চাঞ্চল্যকর জোড়া খুনের মূল রহস্য উদ্ঘাটন করেছে র্যাব-৬। গত ১৯ আগস্ট সংঘটিত এই জোড়া হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রধান অভিযুক্ত সাইফি ও তার এক সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শনিবার (২২ আগস্ট) দুপুরে র্যাব-৬ কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে সংস্থাটির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল নিস্তার আহমেদ এসব তথ্য জানান।
গোপালগঞ্জ সদর থানার মাজিগাতী বাজার এলাকা থেকে শুক্রবার সাইফি (২১) ও তার সহযোগী রফিকুল ইসলাম রাকিবকে (১৭) গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একটি শর্টগান, একটি অতিরিক্ত আগ্নেয়াস্ত্র ও তিনটি দেশীয় চাপাতি উদ্ধার করা হয়।
র্যাব জানায়, গত ১৯ আগস্ট খুলনা মহানগরীর লবণচরা থানার আশিবিঘা কালভার্ট এলাকায় অল্প সময়ের ব্যবধানে দুই যুবককে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেন মঞ্জুরুল ইসলাম (২২) ও নাজমুল (১৮)। জোড়া হত্যাকাণ্ডের পর এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
ঘটনার পর র্যাব-৬-এর গোয়েন্দা দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আলামত সংগ্রহের পাশাপাশি শুরু করা হয় ছায়া তদন্ত। তদন্তে জোড়া হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সাইফি গ্রুপের সরাসরি সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। এরপর খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয়। একপর্যায়ে গোপালগঞ্জের মাজিগাতী বাজার এলাকা থেকে সাইফি ও রাকিবকে গ্রেপ্তার করা হয়।
র্যাবের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সাইফি ও রাকিব জোড়া হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। সাইফির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহত নাজমুল ছিল সাইফি গ্রুপের সদস্য। গ্রুপটি ‘বি কোম্পানি’র মতাদর্শী হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে নিহত মঞ্জুরুল ইসলাম ছিল রফিক গ্রুপের সদস্য। র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, রফিক গ্রুপের সঙ্গে পূর্বে সক্রিয় ‘রক্তপলাশ’ গ্রুপের মতাদর্শগত সম্পৃক্ততা রয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদে সাইফি জানিয়েছে, দুই গ্রুপের বিরোধের জের ধরে সাইফি গ্রুপের সদস্য নাজমুলকে আটক করে রফিক। পরে সাইফিকে ভিডিও কল দিয়ে নাজমুলকে আটকে রাখার দৃশ্য দেখানো হয়। ওই ভিডিও কলের মধ্যেই নাজমুলকে কোপানো এবং মাথায় অস্ত্র দিয়ে আঘাত করার দৃশ্য সাইফিকে দেখানো হয়। এ দৃশ্য দেখার পর ক্ষুব্ধ হয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সাইফি। পরে ১৫ থেকে ১৬ জনের একটি দল নিয়ে অস্ত্রশস্ত্রসহ বের হয়।
র্যাবের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিশোধ নিতে বের হওয়ার পর সাইফি ও তার দল মঞ্জুরুল ইসলামকে সামনে পায়। সন্ধ্যার আগেই তাকে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ সময় মঞ্জুরুলের বাবা ঘটনাস্থলের কাছাকাছি ছিলেন বলেও জানিয়েছে র্যাব।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক ধারণা, নাজমুলের আগে মঞ্জুরুল ইসলামকে হত্যা করা হয়। পরে রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে নাজমুলের গুলিবিদ্ধ ও ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নাজমুলকে আটকে রাখার পর অন্যত্র নিয়ে হত্যা করে মরদেহ ফেলে দেওয়া হয়েছিল, নাকি যে এলাকায় মরদেহ পাওয়া যায় সেখানেই তাকে হত্যা করা হয়—তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
র্যাবের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, শুধু ব্যক্তিগত বিরোধ নয়, দুই গ্রুপের আধিপত্য বিস্তার, মাদক ব্যবসা এবং শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতাও জোড়া হত্যাকাণ্ডের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। সাইফির নেতৃত্বাধীন দলের ১৫ থেকে ১৬ জন এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নিয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে নাজমুলকে আটকে নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় রফিক গ্রুপের অন্তত ৯ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে।
শনাক্ত ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় পুলিশ, কেএমপি, ডিবি ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে শেয়ার করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে সমন্বিতভাবে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে র্যাব।
গ্রেপ্তার সাইফির বয়স মাত্র ২১ বছর। অল্প বয়স হলেও এলাকায় সে সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত বলে জানিয়েছে র্যাব। তার বিরুদ্ধে হত্যা ও মাদকসহ অন্তত চারটি মামলা রয়েছে। অপর গ্রেপ্তার রাকিবের বয়স আনুমানিক ১৭ বছর।
জিজ্ঞাসাবাদে সাইফি আরও দাবি করেছে, লবণচরা এলাকার ‘কাওয়া মিরাজ’-এর নির্দেশে তারা বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত। কাওয়া মিরাজ ‘বি কোম্পানি’র সঙ্গে সম্পৃক্ত বলেও সাইফি জানিয়েছে। তবে তার দেওয়া এসব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে র্যাব।
হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল ও আসামিদের পালানোর সম্ভাব্য পথ পর্যালোচনা করে তিনটি দেশীয় চাপাতি উদ্ধার করা হয়। পরে সাইফিকে গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত অভিযানে একটি শর্টগান ও একটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আরও অস্ত্রের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। জড়িতদের মোবাইল ফোন বন্ধ থাকলেও তাদের অবস্থান শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং বাকি অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
প্রেস ব্রিফিংয়ে র্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশে আইন আছে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মূল লক্ষ্য। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা বা অপরাধের প্রমাণ থাকলে তাকে আইনের আওতায় আনা হবে। তবে মামলা বা সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া কাউকে আটক করা আইনগতভাবে সম্ভব নয়।
র্যাব আরও জানায়, সোহেল ২০২৩ সালের দিকে মারা গেছে এবং পলাশ বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। তবে তাদের নাম ব্যবহার করে কেউ অপরাধ বা চাঁদাবাজি করছে কি না, সে ধরনের অভিযোগও পাওয়া গেছে। বিষয়গুলো যাচাই করা হচ্ছে।
র্যাব-৬ জানিয়েছে, জোড়া হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। জেলা পুলিশ, কেএমপি, ডিবি ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সহযোগিতায় বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অন্যান্য অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত থাকবে।