গাজীপুর জেলার ৭৭৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৯৩টিতেই নেই প্রধান শিক্ষক। দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ এই পদগুলো শূন্য থাকায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে কোনোরকমে চলছে এসব বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম। এতে বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা ও পাঠদান কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
শুধু বিদ্যালয় পর্যায়েই নয়, জেলা পর্যায়েও রয়েছে নেতৃত্বের সংকট। গত বৃহস্পতিবার থেকে শূন্য রয়েছে গাজীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ। এখন পর্যন্ত ওই পদে কাউকে স্থায়ী কিংবা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এতে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রমেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুরে মোট ৭৭৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন ৪৮৩ জন প্রধান শিক্ষক। বর্তমানে ২৯৩টি বিদ্যালয় চলছে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই। এসব বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হচ্ছে।
উপজেলাভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গাজীপুর সদর উপজেলায় ১৬২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৩টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। কালীগঞ্জ উপজেলায় ১২৯টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৩টি বিদ্যালয়ে শূন্য রয়েছে প্রধান শিক্ষকের পদ। কাপাসিয়ায় ১৭৯টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫৭টিতে, কালিয়াকৈরে ১২২টির মধ্যে ৪২টিতে এবং শ্রীপুরে ১৫৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬২টিতে নেই প্রধান শিক্ষক। এছাড়া টঙ্গী এলাকার ১৮টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬টিতেও একই সংকট রয়েছে। সবচেয়ে বেশি সংকট দেখা যাচ্ছে গাজীপুর সদর, কালীগঞ্জ ও শ্রীপুর উপজেলায়।
গাজীপুর জেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে বর্তমানে মোট ১ লাখ ৬৯ হাজার ৬৭৭ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এর মধ্যে ৭৯ হাজার ৮৬০ জন ছেলে এবং ৮৯ হাজার ৮১৭ জন মেয়ে শিক্ষার্থী। এর বাইরে বিভিন্ন কারণে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়েছে।
এদিকে বুধবার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় অনেকটাই নীরব পরিবেশ। কর্মকর্তা না থাকায় সাধারণ সময়ের তুলনায় মানুষের আনাগোনাও কম। কয়েকজন কম্পিউটার অপারেটর ও কর্মচারীকে দাপ্তরিক কাজ করতে দেখা গেলেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুপস্থিতির বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
শিক্ষকেরা জানান, প্রধান শিক্ষক না থাকলে বিদ্যালয়ের দৈনন্দিন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, শিক্ষক-কর্মচারীদের সমন্বয়, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও শৃঙ্খলা তদারকি এবং সরকারি বিভিন্ন নির্দেশনা বাস্তবায়নসহ নানা কাজে জটিলতা তৈরি হয়। ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করায় অনেক সময় মূল পাঠদানে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ শূন্য থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দায়িত্বে না থাকলেও এখন পর্যন্ত নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ কিংবা কাউকে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা হয়নি। শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি প্রশাসনিক নেতৃত্বের এই সংকট দ্রুত সমাধান করা দরকার।
কালিয়াকৈর উপজেলার বাসুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ মালেক হোসেন বলেন, "আমি ২৯ বছর ধরে প্রধান শিক্ষকের ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। অথচ সহকারী শিক্ষকের বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি। আমাদের প্রধান শিক্ষক করার কথা থাকলেও আজও করা হয়নি। এর চেয়ে বড় দুঃখের আর কিছুই নেই।"
মহানগরীর গাজীপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হালিমা শামীম বলেন, "প্রধান শিক্ষক না থাকায় আমি দুই বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। একই সঙ্গে ক্লাস এবং প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব সামলাতে হয়। দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দিলে স্কুলের জন্য ভালো হতো।"
গাজীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কার্যালয়ের সহকারী মনিটরিং কর্মকর্তা মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, "প্রধান শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি সরকারের ওপর নির্ভরশীল। তবে গত বৃহস্পতিবার থেকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নেই। অতিরিক্ত হিসেবে কাউকে এখনো দায়িত্ব দেওয়া হয়নি, যার ফলে প্রশাসনিক কাজে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়েছে।"