নীলফামারীর ডিমলায় ১৬ শতক জমি নিয়ে একটি সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারের দীর্ঘদিনের বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। জমির মালিকানা ও রেকর্ডসংক্রান্ত প্রতিকার চেয়ে সাবিত্রী রানী রায় নামে এক নারী আদালতে মামলা করেছেন। তবে অভিযোগ উঠেছে, আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে বিরোধপূর্ণ ওই জমিতে জোরপূর্বক নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন প্রতিপক্ষ শৈলেশ চন্দ্র রায়, যিনি সম্পর্কে সাবিত্রীর কাকা।

মামলার বিবরণ ও সাবিত্রী রানীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার বাবা অতুল চন্দ্র রায়কে দত্তক নিয়েছিলেন প্যারী মোহন নামের এক ব্যক্তি। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে অতুল চন্দ্রের বিয়ের সময় তার স্ত্রী বিনোদিনী ওরফে বিনোবালার ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ১৬ শতক জমি কিনে তার নামে লিখে দেন প্যারী মোহন। ১৯৯০ সালে সাবিত্রীর বিয়ের পাঁচ বছর পর, অর্থাৎ ১৯৯৫ সালে তার বাবা ভারতে চলে যান। সে সময় জমিটি চাষাবাদের জন্য সাবিত্রীর কাকা শৈলেশ চন্দ্র রায়কে (প্যারী মোহনের নিজের ছেলে) বর্গা দেওয়া হয়।

সাবিত্রীর অভিযোগ, বর্গা চাষের সুযোগ নিয়ে শৈলেশ চন্দ্র রায় পরবর্তীতে কৌশলে জমিটির রেকর্ড নিজের নামে করিয়ে নেন। বহু বছর পর বিষয়টি জানতে পেরে সাবিত্রী ও তার পরিবারের সদস্যরা জমিতে গিয়ে গাছ রোপণ করেন এবং একটি টিনের ঘর নির্মাণ করেন। কিন্তু কিছুদিন পরই শৈলেশ জোরপূর্বক সেই জমি দখল করে গাছপালা উপড়ে ফেলেন এবং টিনের ঘরটি ভেঙে অন্যত্র বিক্রি করে দেন।

জমির মালিকানা ও সঠিক রেকর্ডের দাবি জানিয়ে নীলফামারীর ডিমলা দেওয়ানি আদালতে মামলা করেন সাবিত্রী রানী রায়। তিনি জানান, মামলা করার পর বিবাদীপক্ষ জমিতে ইট, বালু ও সিমেন্ট এনে নির্মাণকাজ শুরু করার প্রস্তুতি নেয়। এ অবস্থায় তিনি আদালতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেন। আদালত নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার বিষয়ে বিবাদীপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিলেও তা অমান্য করে কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলে দাবি তার।

সাবিত্রী রানী রায় বলেন, "আমার জমি দখল করে সেখানে নির্মাণকাজ করা হচ্ছে। আদালতে মামলা করা এবং নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কাজ বন্ধ করা হয়নি। এ বিষয়ে স্থানীয় থানায় লিখিত অভিযোগ করেও প্রতিকার পাওয়া যায়নি।"

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে শৈলেশ চন্দ্র রায় বলেন, "সাবিত্রী রানী যে জমিটি নিজেদের বলে দাবি করছেন, সেটি তাদের নয়।" তার দাবি, অতুল চন্দ্র রায় জমিটি তার কাছে বিক্রি করেছিলেন। শৈলেশ আরও দাবি করেন, ১৯৯০ সালের বিএস রেকর্ড তার নামে রয়েছে এবং দীর্ঘদিন ধরে জমিটি তার দখলেই আছে। নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে শৈলেশ বলেন, "আমার কেনা জমিতে আমি কী করব সেটি আমার বিষয়। যারা মামলা করেছে, তাদের সঙ্গে কোর্টে আইনি লড়াই হবে।"

বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা নারায়ণ চন্দ্র প্রশ্ন তুলে বলেন, "আমি যতটুকু জানি জমির মূল মালিক সাবিত্রীর মা বিনোদিনী রায়। কিন্তু শৈলেশের দাবি তিনি জমি কিনেছেন। জমির মালিক যদি বিনোদিনী হন, তবে শৈলেশ কীভাবে নাবালক মানিক চন্দ্রের কাছ থেকে তা ক্রয় করলেন?"

অন্যদিকে এমাজ উদ্দিন নামে আরেকজন জানান, জমিটি দীর্ঘদিন শৈলেশের দখলেই ছিল, তবে তার এক পালিত ভাই যে ভারতে চলে গেছেন—তা এলাকার সবাই জানেন।

বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রবিউল ইসলাম বলেন, জমিটি নিয়ে মামলা বর্তমানে চলমান রয়েছে। আদালত থেকে এর আগেই বিবাদীপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং কাজ বন্ধের আদেশ দেওয়া হয়েছিল। তা না মানায় গত ২০ আগস্ট উভয় পক্ষকে জমিতে সব ধরনের নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার জন্য পুনরায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

মামলার নথির বরাত দিয়ে তিনি আরও জানান, ১৯৭৪ সালে রাম, শ্যাম ও সুন্দর রায়ের কাছ থেকে জমিটি ক্রয় করে সাবিত্রী রানীর মায়ের নামে রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হয়েছিল। কারণ হিসেবে তারা জানান, তার বাবা জুয়ায় আসক্ত থাকায় মায়ের নিরাপত্তার জন্য জমিটি তার নামে দেওয়া হয়।

ডিমলা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) রেজা বলেন, "আদালতের আদেশের একটি কপি ২০ আগস্ট রাতে আমাদের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগটি তদন্ত করে আইনগত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"