যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে বাংলাদেশি শিক্ষক আবু হানিফ জুয়েলের প্রতিষ্ঠিত সানারিজ টিউটোরিয়াল সেন্টারের ১৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে অ্যাওয়ার্ড অনুষ্ঠান হয়েছে। ৮ আগস্ট রাতে লস অ্যাঞ্জেলেসের বুরব্যাংকের সায়েন্টোলজি অডিটোরিয়ামে এই আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় পাঁচ ঘণ্টার অনুষ্ঠানজুড়ে অ্যাওয়ার্ড বিতরণ, গান, নৃত্য ও বৈচিত্র্যময় পরিবেশনায় অংশগ্রহণকারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের ১০৪ জন শিক্ষার্থীকে নানা ক্যাটাগরিতে অ্যাওয়ার্ড ও সম্মাননা দেওয়া হয়। এলিমেন্টারি স্কুল থেকে টুয়েলভ গ্রেডের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি হার্ভার্ড, কলাম্বিয়া, ইউসিএলএসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীদেরও অভিনন্দন জানানো হয়।

অ্যাওয়ার্ডের তালিকায় ছিল একাধিক স্বীকৃতি—কারও একাডেমিক মেধা, কারও নেতৃত্ব, আবার কারও উন্নতি বা বিশেষ অবদানের জন্য। মোস্ট ইন্সপায়ারিং/ইনফ্লুয়েনশিয়াল স্টুডেন্ট অ্যাওয়ার্ড পান তাজ খান (জিম)। লিডার অ্যাওয়ার্ড পান মেহরান আলম। লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পান গ্রিসেলদা ভাসকেজ। আইভি/এলিট স্কুলস অ্যাডমিটস অ্যাওয়ার্ড পান তানভির। বেস্ট মেমোর অ্যাওয়ার্ড পান শেখ জিবরান (জিবু)।

টপ স্কলার অ্যাওয়ার্ড পান ড. সুলিন চৌধুরী। মোস্ট ইমপ্রুভড স্টুডেন্ট অব অল টাইম অ্যাওয়ার্ড পান সাকিবা। মোস্ট লাইকলি টু সাকসিড—ক্লাস অব ২০২৬ অ্যাওয়ার্ড পান আনিয়া এবং ম্যাথ মাস্টারি অ্যাওয়ার্ড পান আইমান। এছাড়া এলিমেন্টারি থেকে টুয়েলভ গ্রেডের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন পর্যায়ভিত্তিক ক্যাটাগরিতেও অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে ১০৪ শিক্ষার্থী স্বীকৃতি পান।

অনুষ্ঠানে সানারিজের বর্তমান শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার অর্জনকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। হার্ভার্ড, কলাম্বিয়া, ইউসিএলএসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানানো হয়। তাঁদের সাফল্যের গল্প বর্তমান শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা হয়।

সানারিজ টিউটোরিয়াল সেন্টারের ১৫ বছরের পথচলাকে ঘিরে প্রতিষ্ঠানটির শুরু এবং বিকাশের কথাও উঠে আসে। ২০১১ সালে প্রয়াত সেলিম চৌধুরীর সহযোগিতায় লস অ্যাঞ্জেলেসের লিটল বাংলাদেশ এলাকায় একটি টিউটোরিয়াল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন আবু হানিফ জুয়েল। প্রথমে এর নাম ছিল সেফালন টিউটোরিয়াল সেন্টার। ২০১৩ সালে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় সানারিজ টিউটোরিয়াল সেন্টার। গত ১৫ বছরে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেছেন, যাদের প্রায় ৬০ শতাংশ বাংলাদেশি। কোরিয়ান, চীনা, ফিলিপিনো, ভারতীয়, পাকিস্তানি, ইথিওপীয়, মঙ্গোলীয়, লাতিনোসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরাও এখানে পড়েছেন। শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পরে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন।

আয়োজনে প্রয়াত সেলিম চৌধুরীকে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। আবু হানিফ জুয়েলের পথচলার শুরুর দিকে সেলিম চৌধুরীর সহযোগিতার কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সেলিম চৌধুরীর স্ত্রী সালমা চৌধুরী। তাঁকেও ধন্যবাদ জানানো হয়। এছাড়া অনুষ্ঠানের সার্বিক সহযোগিতার জন্য টিপু আলম ও জেবুন আলমের পরিবারকে ধন্যবাদ জানান জুয়েল।

শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিকেও সম্মাননা দেওয়া হয়। কমিউনিটি লিডারশিপ অনার অ্যাওয়ার্ড পান লস অ্যাঞ্জেলেসপ্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম বড় সাংস্কৃতিক আয়োজন ‘আনন্দ মেলা’র উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা খান মোহাম্মদ আলী। পুরস্কার গ্রহণের পর খান মোহাম্মদ আলী বাংলাদেশিদের পরিচালিত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এমন স্বীকৃতি পাওয়ায় কৃতজ্ঞতা জানান এবং সানারিজ টিউটোরিয়াল সেন্টার ও আবু হানিফ জুয়েলের প্রতিও ধন্যবাদ জানান।

অনুষ্ঠানে সমাজসেবী নাসির খান শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় উৎসাহিত করতে ‘নাসির খান স্কলারশিপ’ চালুর প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। মেধাবী ও উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ পথচলায় সহযোগিতা করাই এ উদ্যোগের লক্ষ্য—এমনটাই জানান আয়োজকেরা।

পুরো আয়োজনটি শুধু অ্যাওয়ার্ড বিতরণেই সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল প্রতিভা তুলে ধরতে গান, নৃত্য ও ট্যালেন্ট শো হয়। বিভিন্ন বয়সের শিক্ষার্থীরা মঞ্চে নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরে। শেষদিকে মাইকেল জ্যাকসনের গানের সঙ্গে নৃত্য পরিবেশনার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক পর্বের সমাপ্তি হয়।

বাংলাদেশি পরিবারগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবারের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি এক বহুজাতিক মিলনমেলায় রূপ নেয়। শেষদিকে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অতিথিরা মঞ্চে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে ছবি তোলেন। কারও গলায় মেডেল, কারও হাতে অ্যাওয়ার্ড—মুখে সাফল্যের হাসি। ১৫ বছরের পথচলার সেই ছবিগুলোকে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অর্জনের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।