সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে লক্ষ্মীপুর-ভোলা নৌরুটে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে ছোট ট্রলার ও ইঞ্জিনচালিত নৌযান। উত্তাল মেঘনা নদীতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও লাইফ জ্যাকেট ছাড়াই প্রতিদিন পারাপার হচ্ছেন শত শত যাত্রী। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন ও নৌ-পুলিশের নজরদারির ঘাটতির সুযোগে এসব অবৈধ নৌযান চলছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
জানা গেছে, নৌ-দুর্ঘটনা এড়াতে প্রতি বছর ১৫ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত মেঘনার নির্দিষ্ট এলাকাকে 'ডেঞ্জার জোন' ঘোষণা করা হয়। এই সময়ে সরকারি সি-ট্রাক ছাড়া ছোট ইঞ্জিনচালিত নৌযান ও মাছ ধরার ট্রলারে যাত্রী পরিবহনে নিষেধাজ্ঞা থাকে। তবে লক্ষ্মীপুরের মজুচৌধুরীরহাট থেকে ভোলা এবং রামগতির আলেকজান্ডার হয়ে হাতিয়া, গজারিয়া, দৌলতদিয়া ও বরিশালমুখী বিভিন্ন রুটে এই নিয়ম মানা হচ্ছে না। সম্প্রতি নদীতে তলিয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। 이에 নিরাপদ নৌযান ও পর্যাপ্ত লঞ্চ সার্ভিস চালুর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
ট্রলারে যাতায়াতকারী ভোলার বাসিন্দা মো. সেলিম হোসেন বলেন, "আমি চট্টগ্রাম থেকে ভোলায় যাচ্ছি। সি-ট্রাক ও ফেরি না পেয়ে বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছোট মাছ ধরার কাঠের ট্রলারে ভোলার উদ্দেশে রওনা হয়েছি।"
মজুচৌধুরীরহাট ঘাটে অপেক্ষমাণ ভোলার বাসিন্দা মো. জাকির হোসেন বলেন, "আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে মেঘনা নদী চরম উত্তাল থাকে। বর্ষা মৌসুমে ট্রলারে যাত্রী পারাপার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু ফেরি বন্ধ থাকায় এক শ্রেণির ট্রলার মালিক ঝুঁকি নিয়ে লক্ষ্মীপুর-ভোলা নৌরুটে যাত্রী পারাপার করছেন। ভোলা ও লক্ষ্মীপুরের রামগতির আলেকজান্ডার হয়ে হাতিয়া, গজারিয়া, দৌলতদিয়া ও বরিশালসহ বিভিন্ন রুটে হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করছেন।"
ট্রলার মালিক সেলিম মাঝী জানান, প্রতি যাত্রীর কাছ থেকে ১০০ টাকা এবং মহিষ ও অন্যান্য মালামাল বাবদ এক হাজার বা তার কম ভাড়া নেওয়া হয়। প্রতিটি ট্রলারে ২০ থেকে ৩০ জন যাত্রী নিয়ে মেঘনা পাড়ি দেওয়া হয়।
মজুচৌধুরীরহাট ঘাটে ভোলাগামী যাত্রী মফিজুল ইসলাম বলেন, "সি-ট্রাক ও ফেরি না পেয়ে বাধ্য হয়ে ছোট ট্রলারে উঠতে হচ্ছে। নদী এখন অনেক উত্তাল। এভাবে পারাপার হতে ভয় লাগে। একটি বড় দুর্ঘটনা ঘটলে অনেক মানুষ একসঙ্গে প্রাণ হারাতে পারেন।"
আরেক ট্রলার মালিক শহীদ মাঝি বলেন, "নদী উত্তাল থাকলেও যাত্রীরা পারাপার হতে চান। আমরা যাত্রীপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ টাকা ভাড়া নিচ্ছি এবং একটি ট্রলারে ২০ থেকে ৩০ জন পর্যন্ত যাত্রী উঠছে। তবে এ সময় নদী পারাপার ঝুঁকিপূর্ণ—এটা আমরাও জানি। আল্লাহর নামে চলি, তাই ভয় থাকে না।"
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি অভিযোগ করেন, প্রশাসনকে নিয়মিত মাসোহারা দিয়ে প্রভাবশালী একটি মহল অবৈধভাবে যাত্রী পারাপার করছে।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রামগতির বড়খেরী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. হালিম। তিনি বলেন, "প্রশাসনের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ সত্য নয়। নদী উত্তাল থাকায় আমাদের অগোচরে কিছু ট্রলার যাত্রী পারাপার করছে। অবৈধভাবে যাতে ট্রলার চলতে না পারে, সে বিষয়ে আমরা সতর্ক রয়েছি।"
মজুচৌধুরীরহাট নদীবন্দরের সহকারী বন্দর ও পরিবহন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহ আলম জানান, প্রতি বছর ১৫ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত এই এলাকা ডেঞ্জার জোন হিসেবে বিবেচিত হয় এবং সি-ট্রাক ছাড়া ছোট নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকে। নিয়ম অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
লক্ষ্মীপুর সদর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন কর্মকর্তা রঞ্জিত কুমার সাহা অবৈধ নৌযান ও স্পিডবোট চলাচল বন্ধের পাশাপাশি লাইফবয়া ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম রাখার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, চাঁদপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত নৌ-পুলিশ সুপার সৈয়দ মুসফিকুর রহমান জানান, নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে তারা কোনো চিঠি পাননি এবং বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। তবে তিনি বলেন, "বর্ষা মৌসুমে ট্রলারে চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এ জন্য যাত্রীদের তা মেনে যাতায়াত করা উচিত।" তিনি চালকদের ঝুঁকিপূর্ণভাবে নদীতে চলাচল না করার পরামর্শ দেন।