চরমোনাই পীর মুফতি সৈদ মুহাম্মাদ রেজাউল করীমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে এ ঘোষণা দেওয়ার পর সিদ্ধান্ত বদলে বিকেলেই ভোট দিয়েছেন দলটির একমাত্র সংসদ সদস্য মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহ।

শেষ মুহূর্তে কী কারণে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়েছে, তা জানতে মাওলানা মাহমুদুল হোসাইন অলিউল্লাহর সঙ্গে বিকেল থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি সাড়া দেননি। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও কোনো জবাব দেননি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামী আন্দোলনের মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান সন্ধ্যায় মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন না হওয়ায় তাঁরা ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে পরবর্তীকালে বিএনপির বক্তব্যে তাঁরা আশ্বস্ত হয়েছেন, আগামী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন জুলাই সনদের আলোকে হবে এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ বাতিল করা হবে। এ কারণে তাঁরা সংসদ সদস্য নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন।

আজ বেলা দুইটার দিকে জাতীয় সংসদের সংসদকক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ভোট গ্রহণ চলে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত।

ভোট গ্রহণের আগে দুপুরে সংসদ ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয়ে কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে সংবিধানের যে সংশোধনী আসবে, ৭০ ধারাতেও পরিবর্তন আসবে। জুলাই জাতীয় সনদে আমরা যেভাবে একমত হয়েছি, সেভাবে ৭০ অনুচ্ছেদ যদি সংশোধিত হয়ে যায়, তার পরবর্তী সময়ে যখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে, তখন সেই ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারেই হবে। কিন্তু এখনো তো সংবিধান সংশোধন হয়নি।’

ক্ষমতাসীন বিএনপি জোটের ২৫০ ও বিরোধী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের ৯০ আসনের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের ভোটার হিসেবে ৮ জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যও ছিলেন। তবে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা, বিএনপির মির্জা আব্বাস, মোস্তফা কামাল পাশা ও ওসমান ফারুক, খেলাফত মজলিসের আবুল হাসান এবং জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম এ নির্বাচনে ভোট দেননি।

ভোটের ফলাফল অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি পেয়েছেন ২৫৫ ভোট। আর ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট।

বিবৃতিতে কী বলেছিল ইসলামী আন্দোলন

আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে গণমাধ্যমে একটি বিবৃতি পাঠায় ইসলামী আন্দোলন। বিবৃতিতে দলটির মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিষয়ে জুলাই সনদে ঐকমত্য হওয়া সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসায় এ নির্বাচনে ভোট দেবেন না তাঁরা।

ইসলামী আন্দোলনের বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে যে সংকট, তার অন্যতম কারণ দলীয় রাষ্ট্রপতি। সেই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে রাষ্ট্রপতির নির্বাচন বিষয়ে বেশ কিছু নীতিতে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে বিএনপিরও ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) ছিল না। তারা প্রত্যাশা করেছিল, জুলাই সনদের সেই ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া নীতিকে মান্য করে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। কিন্তু তা যেহেতু হয়নি, তাই এ নির্বাচনে ভোট দেওয়াকে তারা সমীচীন মনে করছে না।

ইসলামী আন্দোলনের বিবৃতিতে আরও বলা হয়, জুলাই সনদে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া বিষয়গুলোর মধ্যে রাষ্ট্রপতি শিরোনামে ধারা-১০-এ বর্ণিত হয়েছে যে রাষ্ট্রপতি আইনসভার উভয় কক্ষের (উচ্চ ও নিম্নকক্ষ) সদস্যদের গোপন ভোটে নির্বাচিত হবেন। এ ধারায় বিএনপিও একমত হয়েছিল। ধারা-২৮-এ বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দান প্রসঙ্গে অর্থ বিল ও আস্থা ভোট বাদে অন্য সব ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। এ বিষয়ে বিএনপিসহ সবাই একমত হয়েছে। কোনো ‘নোট অব ডিসেন্ট’ নেই। কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জুলাই সনদে ঐকমত্য হওয়া এই দুটি বিষয়ের কোনোটিই মান্য করা হচ্ছে না। এটা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে গাদ্দারি ছাড়া আর কিছু নয়।

ইসলামী আন্দোলন আরও প্রশ্ন তোলে, যে নীতি ও আইনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হচ্ছে, সেটিকে আদৌ নির্বাচন বলা যায় কি না বা এর কোনো প্রয়োজন আদতেই আছে কি না। দলটির মহাসচিব গাজী আতাউর রহমান তাঁর বিবৃতিতে বলেন, ৭০ অনুচ্ছেদ বহাল থাকায় কে রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন, তা নিশ্চিত হয়েই আছে। তাহলে এত সব নাটক মঞ্চস্থ করার কী অর্থ আছে? আক্ষরিক অর্থে এখানে নির্বাচন কমিশন, সংসদ সদস্য ও সংসদের কাজ কী? এগুলো জনগণের টাকা নষ্ট ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে হেয় করা ছাড়া আর কিছু নয়।