দীর্ঘ ৩৫ বছর পর বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য আজ বৃহস্পতিবার বেলা দুইটায় জাতীয় সংসদের সংসদকক্ষে ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। ভোটপ্রক্রিয়ার শুরুতে প্রথমে ভোট প্রদান করেন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর একে একে অন্যান্য সংসদ সদস্যরা ভোটদান শুরু করেন।

এই নির্বাচনে দুজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন বিএনপির সদ্য সাবেক মহাসচিব ও মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। বিএনপি প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদ সদস্য হওয়ায় নিয়ম অনুযায়ী তিনি নিজেও ভোট দিয়েছেন। তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর সংসদীয় আসনটি শূন্য হবে। অন্যদিকে, অলি আহমদ সংসদ সদস্য না হওয়ায় তাঁর ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই।

নির্বাচন উপলক্ষে ডাকা বিশেষ বৈঠকের শুরুতে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করা হয়। শুরুতে মাইকের কিছু কারিগরি সমস্যা দেখা দিলেও দ্রুত তা সমাধান করা হয়। এরপর নির্বাচনী কর্তা প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন ভোটার সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য প্রদান করেন। তিনি বলেন, "সংবিধানের ৪৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভোটের মাধ্যমে আজ সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন।"

সিইসি আরও জানান, "এ নির্বাচনে দুজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বাংলা নামের আদ্যক্ষর অনুযায়ী প্রথম প্রার্থী অলি আহমদ। তাঁর প্রস্তাবক শফিকুর রহমান (বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির), সমর্থক আবদুল্লাহ আল আমিন (এনসিপির সংসদ সদস্য)। দ্বিতীয়জন হলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাঁর প্রস্তাবক আবদুল মঈন খান, সমর্থক গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।"

১৯৯১ সালের আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী ভোটদানের পদ্ধতি ব্যাখ্যা করার পর ভোটগ্রহণ শুরু হয়। বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলবে এবং এরপর গণনা শুরু হবে। গণনা শেষে সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন সংসদকক্ষেই ফলাফল ঘোষণা করবেন, যা পরবর্তীতে গেজেটের মাধ্যমে প্রকাশ করা হবে।

উল্লেখ্য, গত ২৪ জুলাই আওয়ামী লীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) আমলে নির্বাচিত মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়, যার প্রেক্ষিতে ৬ আগস্ট নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করে।

বর্তমানে সংসদের অধিবেশন না থাকায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য আলাদা বৈঠক ডাকা হয়েছে, যার সভাপতিত্ব ও পরিচালনা করছেন সিইসি। এই নির্বাচন গোপন নয়; সংসদ সদস্যরা ব্যালটে পছন্দের প্রার্থীর নামের পাশে পূর্ণ নাম লিখে স্বাক্ষর করবেন। চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম জানিয়েছেন, নতুন রাষ্ট্রপতি আগামীকাল শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটায় বঙ্গভবনে শপথ গ্রহণ করবেন।

রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনরত স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এবং ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামালও ভোটার হিসেবে অংশ নিয়েছেন, তাঁদের জন্য আলাদা আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের পর প্রথমবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর সাতজন রাষ্ট্রপতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ায় এবার দ্বিতীয়বারের মতো ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়।

সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনসহ জাতীয় সংসদে মোট আসন ৩৫০টি। তবে চট্টগ্রাম-৪ আসনের ফলাফল ঘোষণা না হওয়ায় মোট ভোটারের সংখ্যা ৩৪৯ জন। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন বিএনপির সদস্য ২৪৭ জন এবং মিত্র দল বিএনপি, গণ অধিকার পরিষদ ও গণসংহতি আন্দোলনের একজন করে সদস্যসহ মোট আসন ২৫০টি। অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের সদস্য ৯০ জন, যার মধ্যে জামায়াতের ৭৭ জন এবং জাগপার ১ জন সংরক্ষিত নারী সদস্য রয়েছেন। এছাড়া এনসিপির আটজন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের তিনজন, খেলাফত মজলিসের একজন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন এবং স্বতন্ত্র আটজন সদস্য রয়েছেন।

সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দলের বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগ না থাকায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জয় কার্যত নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে, তবে প্রার্থী দুজন থাকায় নিয়ম অনুযায়ী ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।