নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়ায় সরকারি কার্যালয়ে হামলা এবং কর্মকর্তাদের লাঞ্ছিত করার ঘটনায় বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে এজাহার দায়েরের পরদিনই রদবদল করা হয়েছে জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে (ইউএনও)। নাটোরের ডিসি আসমা শাহীনকে প্রত্যাহার এবং লালপুর ইউএনও বরকত উল্লাহকে বদলি করা হয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব বরমান হোসেন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে ডিসি আসমা শাহীনকে প্রত্যাহার করে পরবর্তী পদায়নের জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে স্থানান্তর করা হয়েছে। অন্যদিকে, রাজশাহী বিভাগীয় সিনিয়র সহকারী কমিশনার প্রীতিলতা বর্মণ স্বাক্ষরিত পৃথক আদেশে লালপুর ইউএনও বরকত উল্লাহকে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরপরই এই রদবদলের ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ১২ আগস্ট। ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার পদে নিয়োগের ফলাফল প্রকাশ নিয়ে লালপুর ও বাগাতিপাড়া ইউএনও কার্যালয়ের সামনে একদল সশস্ত্র নেতাকর্মী বিক্ষোভ করেন। অভিযোগ উঠেছে, ওই সময় তারা কর্মকর্তাদের কক্ষে ভাঙচুর করেন এবং সরকারি কর্মকর্তা ও স্থানীয় সাংবাদিকদের লাঞ্ছিত করেন।

এই ঘটনার পাঁচ দিন পর, ১৭ আগস্ট লালপুর ও বাগাতিপাড়া থানায় দুটি পৃথক এজাহার দায়ের করা হয়। লালপুর ইউএনও কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবু মাসুদ রানা এবং বাগাতিপাড়া ইউএনও কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা শুকুর আলী বাদী হয়ে মামলা দুটি করেন। এজাহারে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের ২৫ জন নামীয় নেতাকর্মীসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১৪০ থেকে ২০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

লালপুর থানায় দায়ের করা এজাহারে অভিযুক্ত ১৮ জন হলেন— নাটোরের লালপুর উপজেলার গোপালপুর পৌর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম মোলাম, বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও ইউপি চেয়ারম্যান সিদ্দিক আলী মিষ্টু, ঈশ্বরদী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ও ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ রঞ্জু, উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব হারুন অর রশিদ পাপ্পু, চংধুপইল ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান জুলহাস, উপজেলা বিএনপির সাবেক ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ফিরোজ উদ্দিন, কদিমচিলান ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক আব্দুল বারী কাজল, কদিমচিলান ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি হযরত আলী, দুয়ারিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক শাহিনুর রহমান, আরবাব ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম, কদিমচিলান ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হযরত আলী, চংধুপইল ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ইলিয়াস হোসেন, এবি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মোহাম্মদ আবেদ আলী, লালপুর ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক/সদস্য সচিব মোহাম্মদ রবিউল ইসলাম রবি, পৌর বিএনপির মোহাম্মদ আলী আজম, উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক রায়হান কবীর সুইট, উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক আবু রায়হান এবং পৌর যুবদল নেতা সুমন। এছাড়া অজ্ঞাত আরও ৪০ থেকে ৫০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

অন্যদিকে বাগাতিপাড়া থানায় দায়েরকৃত এজাহারে অভিযুক্ত সাতজন হলেন— উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সোহেল রানা, যুগ্ম আহ্বায়ক তারিক আজিজ, উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য আশিকুর রহমান, উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মোশারফ হোসেন, মোস্তাফিজুর রহমান, বাগাতিপাড়া পৌর ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোতালেব আলী পান্না এবং উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সাব্বির হোসেন মুন্না। এই এজাহারে অজ্ঞাত আরও ১০০ থেকে ১৫০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

এই রদবদলের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং স্থানীয় সুশীল সমাজ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নাটোর জেলা শাখার আহ্বায়ক আব্দুস সামাদ শিশির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, "সরকারি কার্যালয়ে হামলার মামলা করার পরেই ডিসি প্রত্যাহার ও ইউএনও বদলি! যে দেশে নির্ভীক কর্মকর্তারা ক্ষমতার কাছে নতিস্বীকার না করার কারণে শাস্তির মুখে পড়েন, সে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা শঙ্কিত।"

সনাক ও দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির (সনাক) নাটোর জেলার সাবেক সভাপতি রনেন রায় বলেন, "সঠিক কাজ করতে গেলেই অসৎ ব্যক্তিদের রোষানলে পড়তে হচ্ছে। নাটোরের ডিসি প্রত্যাহার ও ইউএনও বদলি তারই উদাহরণ।"

জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির (দুপ্রক) সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, "অপরাধী যে-ই হোক, তার আইনি পরিচয় একটাই। কর্মকর্তাদের এভাবে হয়রানি করা হলে প্রশাসনে সৎ ও নির্ভীক মানসিকতা ভেঙে পড়বে।"

ঘটনার বিষয়ে নাটোর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান আসাদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "বিএনপি কখনোই ভাঙচুর বা সহিংসতার রাজনীতি সমর্থন করে না। অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার পক্ষে আমরাও। তবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কোনো নির্দোষ নেতাকর্মীকে যেন ঢালাওভাবে হয়রানি না করা হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে হবে।"

বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন ও ইউএনও বরকত উল্লাহ কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। মামলার বিষয়ে নাটোরের পুলিশ সুপার শরীফুল হক জানান, এটি নিয়ে তিনি অফিশিয়ালি কোনো মন্তব্য করবেন না।