প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব পালনে কতটা সন্তুষ্ট করতে পারছেন—বিএনপি সরকারের ছয় মাস পূর্তি উপলক্ষে পরিচালিত এক জরিপে উত্তরদাতাদের কাছে এই মূল্যায়ন জানতে চাওয়া হয়। জরিপে ৬৬ দশমিক ৩০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁর দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করছেন। এ মূল্যায়ন বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষা ও আয়—সব শ্রেণিতে প্রায় অভিন্ন বলে উল্লেখ করা হয়।
প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৫০ শতাংশ, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সমর্থকদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৮০ শতাংশ এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৫২ দশমিক ৫০ শতাংশ সমর্থকও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর কাজে সন্তুষ্ট বলে প্রতিবেদনে এসেছে।
ডপলার অপিনিয়ন রিসার্চ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ‘অ্যাপ্রুভাল রেটিং সার্ভে ২০২৬’ শীর্ষক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। আজ বুধবার বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিডা ভবনের মাল্টিপারপাস হলে এক অনুষ্ঠানে জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
একই জরিপে সরকারের সামগ্রিক পারফরম্যান্স (কর্মতৎপরতা) সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে চিত্র কিছুটা ভিন্ন দেখা যায়। সরকার ভালোভাবে তার দায়িত্ব পালন করছে বলে মনে করেন ৫৪ দশমিক ৫০ শতাংশ মানুষ। অন্যদিকে খারাপ বলেছেন ৩২ দশমিক ৯০ শতাংশ মানুষ।
দেশ সঠিক নাকি ভুল পথে যাচ্ছে—এই প্রশ্নে উত্তরদাতাদের ৪৮ দশমিক ৬০ শতাংশ বলেছেন, দেশ সঠিক পথে যাচ্ছে। ভুল পথে যাচ্ছে মনে করেন ৩৫ দশমিক ৬০ শতাংশ। ১৫ দশমিক ৮০ শতাংশ কোনো উত্তর দেননি। বিএনপির সমর্থকদের ৬৫ দশমিক ৫০ শতাংশ, জামায়াত সমর্থকদের ৪৪ শতাংশ এবং এনসিপি সমর্থকদের ৫৫ দশমিক ২০ শতাংশ দেশ সঠিক পথে যাচ্ছে বলে মত দেন। আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ক্ষেত্রে এই হার সর্বনিম্ন—৩৪ দশমিক ৪০ শতাংশ।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের ১৮০ দিন বা ছয় মাস পূর্তি হয়েছে গত রোববার। এ উপলক্ষে জনমত জরিপ পরিচালনা করেছে ডপলার। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনোভিশন কনসাল্টিংয়ের ধারাবাহিকতায় জন্ম নেওয়া প্রতিষ্ঠানটি জরিপের জন্য ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইনোভিশনের এক জরিপে অংশ নেওয়া ১০ হাজার ৪১৩ জনের সঙ্গে সম্প্রতি টেলিফোনে যোগাযোগ করেছিল। ডপলারের জরিপে অংশ নেন ৩ হাজার ৪৪৩ জন। এ নমুনায় দেশের ৬৪টি জেলার ৪৮৯টি ওয়ার্ড ও গ্রামের প্রতিনিধিত্ব ছিল।
জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান (বিরোধীদলীয় নেতা) ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম (বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ) সংসদে কেমন ভূমিকা রাখছেন—এমন প্রশ্ন ছিল জরিপে। শফিকুরের ক্ষেত্রে ৪৭ দশমিক ৭০ শতাংশ এবং নাহিদের ক্ষেত্রে ৩৯ দশমিক ৮০ শতাংশ মানুষ ‘ইতিবাচক’ মত দিয়েছেন। পুরুষদের মধ্যে ৫২ দশমিক ৯০ শতাংশ শফিকুরের ব্যাপারে ইতিবাচক হলেও নারীদের ক্ষেত্রে হার ৪২ দশমিক ৮০ শতাংশ। অন্যদিকে পুরুষদের মধ্যে নাহিদের ৪৩ দশমিক ৮০ শতাংশ সমর্থন থাকলেও নারীদের ক্ষেত্রে তা ৩৬ শতাংশ।
এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সমর্থন বেশি ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে (৪৬ দশমিক ৭০ শতাংশ), সবচেয়ে কম ষাটোর্ধ্বদের মধ্যে (৩০ দশমিক ৭০ শতাংশ)। জরিপে আরও বলা হয়েছে, ৩২ দশমিক ১০ শতাংশ মানুষ শফিকুর রহমান সম্পর্কে এবং ৩৭ দশমিক ২০ শতাংশ মানুষ নাহিদ ইসলাম সম্পর্কে যথেষ্ট না জানার কথা উল্লেখ করেছেন।
দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা কী—জরিপে এই প্রশ্নে কোনো তালিকা না দিয়ে উত্তর জানতে চাওয়া হয়। এর উত্তরে ৫৯ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা বলেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির কথা, এবং ৫৯ দশমিক ১০ শতাংশ বলেন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অতিরিক্ত দামের কথা। তৃতীয় স্থানে আইনশৃঙ্খলা (৩২ দশমিক ৬০ শতাংশ) এবং চতুর্থ স্থানে কর্মসংস্থান (৩০ দশমিক ৮০ শতাংশ)।
যে দুটি বিষয়কে সবচেয়ে বড় সমস্যা বলা হয়েছে, সেই দুটিতেই সরকারের কাজের মূল্যায়ন সবচেয়ে খারাপ এসেছে জরিপে। ৮৯ দশমিক ৪০ শতাংশ বলেছেন, সরকারের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা খারাপ হচ্ছে। জ্বালানি ও গ্যাসের ক্ষেত্রে ৭৯ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং নিত্যপণ্যের মূল্যের ক্ষেত্রে ৬৯ দশমিক ১০ শতাংশ একই কথা বলেছেন। বিভাগ, আয় বা শিক্ষার ভিত্তিতে এই মূল্যায়নে খুব একটা হেরফের হয়নি।
ডপলারের জরিপে ৪৬ দশমিক ৫০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, এক বছর আগের তুলনায় তাঁদের পরিবারের অবস্থা খারাপ হয়েছে, ভালো হয়েছে বলেছেন ১৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। সামনের ১২ মাসে আর্থিক অবস্থা ভালো হবে বলে আশা করছেন ৩৮ দশমিক ১০ শতাংশ, খারাপ হবে বলে মনে করছেন ২৪ দশমিক ৩০ শতাংশ। দেশ নিয়ে ৪৮ দশমিক ৪০ শতাংশ এক বছর আগের চেয়ে বেশি আশাবাদী, ৩৯ শতাংশ কম আশাবাদী এবং ৬ দশমিক ২০ শতাংশ বলেছেন দেশে কিছুই বদলায়নি।
জরিপের ফল অনুযায়ী, ৬৭ দশমিক ৫০ শতাংশ মানুষ এখন নিজেদের এলাকায় অন্ধকারে একা হাঁটতে নিরাপদ অনুভব করেন। তবে পুরুষদের মধ্যে এই হার ৭০ দশমিক ৯০ শতাংশ হলেও নারীদের ক্ষেত্রে ৬৪ দশমিক ৩০ শতাংশ। এ ছাড়া জরিপ অনুযায়ী ৯৫ দশমিক ২০ শতাংশ মানুষ এখন নিজেদের ধর্ম উন্মুক্তভাবে পালনে নিরাপদ বোধ করছেন। মুসলমান উত্তরদাতাদের মধ্যে ৯৭ দশমিক ১০ শতাংশ এ কথা বললেও হিন্দুদের মধ্যে এটি ৮২ শতাংশ, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানদের ক্ষেত্রে ৮১ দশমিক ১০ শতাংশ।
ফ্যামিলি কার্ড, করনীতি এবং গণভোটের রায় বিষয়ে জরিপে বলা হয়েছে, সরকারের ফ্যামিলি কার্ড প্রকল্পকে সমর্থন করছেন ৭৮ দশমিক ৬০ শতাংশ মানুষ, করনীতিকে সমর্থন করেছেন ৭০ দশমিক ৭০ শতাংশ। এ ছাড়া জরিপে অংশ নেওয়া ৭০ শতাংশ মনে করেন, গণভোটের ফল সরকারের বাস্তবায়ন করা উচিত।
এলাকার সংসদ সদস্যের (এমপি) কাছে গেলে তাঁরা কতটা শোনেন—এই প্রশ্নের উত্তরে জরিপে ৫০ দশমিক ৯০ শতাংশ মানুষ ইতিবাচক উত্তর দিয়েছেন। আর ৩৫ দশমিক ৯০ শতাংশ মানুষ বলেন, এমপির কাছে গেলে সমস্যা শুনবেন না।
ফল প্রকাশের পর অনুষ্ঠানটিতে প্যানেল আলোচনা হয়। আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ মোহাম্মদ শাহান, বিডা ও বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বিডিজবসের প্রতিষ্ঠাতা এ কে এম ফাহিম মাশরুর, ইনোভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবাইয়াৎ সারওয়ার এবং এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব ফরিদুল হক।