ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে শিক্ষার্থী হেনস্তার অভিযোগ ওঠার পর প্রাধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ ও মারামারির ঘটনার তদন্তে গঠিত কমিটির সদস্যদের সঙ্গে হল সংসদের নেতাদের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। আজ মঙ্গলবার দুপুরে হলের প্রাধ্যক্ষের (প্রভোস্ট) কার্যালয়ে এ ঘটনা ঘটে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল রতনের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটির সদস্যরা দুপুরে হল প্রাধ্যক্ষের কার্যালয়ে গিয়ে ১৬ আগস্টের ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেন। খবর পেয়ে সেখানে যান হল সংসদের নেতারা। ইসলামী ছাত্রশিবির–সমর্থিত এসব নেতারা তদন্ত কমিটির কাছে ওই দিন প্রাধ্যক্ষের উপস্থিতিতে শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহিমকে হেনস্তার অভিযোগের ঘটনার ফুটেজের কপি চান। তদন্ত কমিটির সদস্যরা ফুটেজের কপি দিতে না চাইলে শিক্ষার্থীরা তদন্ত কমিটির সদস্যদের পথ আটকে দেন। তাঁরা জানান, ওই ফুটেজের কপি না দিয়ে যেতে পারবেন না।

এ সময় প্রক্টরসহ তদন্ত কমিটির সদস্যরা এবং অন্যান্য শিক্ষক ও প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যদের উপস্থিতিতে হল সংসদের নেতাদের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায় প্রক্টর উপাচার্যের কার্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওই ঘটনার ফুটেজ দেখার সুযোগ দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। উপাচার্যের কার্যালয়ে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে হল সংসদের নেতারা সরে আসেন। এরপর প্রক্টরসহ তদন্ত কমিটির সদস্যরাও সেখান থেকে চলে আসেন।

ঘটনার বিষয়ে হল সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) খন্দকার মো. আবু নাঈম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ফজলুল হক মুসলিম হলে প্রক্টরিয়াল টিম ফুটেজ গায়েব করার চেষ্টা করছে। ফজলুল হক মুসলিম হল সংসদের ভিপি হিসেবে বলতে চাই, সিসিটিভি ফুটেজের কপি না দিয়ে প্রক্টরিয়াল টিম যেতে পারবে না। তারা তদন্তের নামে টালবাহানা ও ফুটেজ গায়েব করার পাঁয়তারা করছে। এই ফুটেজ আমাদের লাশের ওপর দিয়ে নিয়ে যেতে হবে।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল রতন বলেন, ‘উপাচার্যের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির সদস্য ও প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা তদন্তের স্বার্থে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে সেখানে গিয়েছিলেন। সেখানে হল সংসদের নেতারা দাবি করেন, ফুটেজের একটি কপি তাঁদের দিতে হবে। পরবর্তীতে কেন তালা খোলা হলো, কেন নেওয়া হবে—এসব কথায় বাদানুবাদ হয় এবং আমাদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে। তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন যে তাঁদের এক কপি না দিয়ে এখান থেকে যাওয়া যাবে না।’

তিনি আরও বলেন, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ বা অন্য কারও কাছে হস্তান্তরের সুযোগ নেই। প্রক্টর বলেন, ‘আমরা ভিডিও ফুটেজটি কপি করেছি। কিন্তু এটা আমরা সংগ্রহ করেছি তদন্তের স্বার্থে। কোনো অভিযোগ আসলে এটা কি তদন্তের আগে জনসমক্ষে আনা যায়? আর এটা তো ক্লিপ নয়, এটি বড় একটি অংশ। অনেক ঘটনা তো ঘটে গেছে এই কয়েক দিনে।’

পরবর্তী সময়ে হল সংসদের নেতাদের বিষয়টি বুঝিয়ে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে বলে জানান প্রক্টর অধ্যাপক ইসরাফিল রতন।

যে ঘটনায় তদন্ত কমিটি

ফেসবুকে একটি পোস্ট শেয়ার করাকে কেন্দ্র করে গত রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুরে ফজলুল হক মুসলিম হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহিমকে প্রাধ্যক্ষের কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়। প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ইলিয়াস আল মামুনে সেখানে তাঁকে আটকে রেখে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করেন বলে অভিযোগ করেছেন ওই শিক্ষার্থী। এ ঘটনায় ওই দিন রাত ৯টার দিকে প্রাধ্যক্ষকে হলে অবরুদ্ধ করেন হল সংসদের নেতা ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীরা। একপর্যায় সেখানে যান ডাকসুর কয়েকজন নেতাও। তাঁরা প্রাধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ করে তাঁর পদত্যাগের দাবিতে নানা স্লোগান দেন। রাত পৌনে তিনটা পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে। এরপর ছাত্রদলের হলের নেতা-কর্মীরা এসে প্রাধ্যক্ষকে বের করে নেন। এ সময় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে মারামারিতে কয়েকজন আহত হন।

এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সেই তদন্ত কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই আজ হলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করতে যান তদন্ত কমিটির সদস্য ও প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্যরা।

পরে সন্ধ্যা সাতটার দিকে ফজলুল হক হলের অভিযোগকারী শিক্ষার্থী, হল সংসদের সদস্য ও ডাকসুর নেতারা উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ঘটনার বিস্তারিত শোনার পর উপাচার্যের নির্দেশে ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ–সংবলিত পেনড্রাইভ শিক্ষার্থীদের সামনে সিলগালা করে উপাচার্যের কাছে জমা দেওয়া হয়। পরে প্রক্টর ওই শিক্ষার্থী ও ছাত্র প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে ফুটেজটি পর্যালোচনা করার আশ্বাস দেন।