সুনামগঞ্জের জেলাজুড়ে ৪৫১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় একাধারে পাঠদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাচ্ছেন সহকারী শিক্ষকেরা। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে এই দ্বৈত দায়িত্ব পালনের ফলে কোনো কাজই সঠিকভাবে করা সম্ভব হচ্ছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

তাহিরপুর উপজেলার টাঙ্গুয়ার হাওরপাড়ের মান্দিয়াতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. সানজু মিয়া তার ভোগান্তির কথা জানাতে গিয়ে বলেন, "বিদ্যালয়ে শিশুশ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ১৩২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রধান শিক্ষকসহ পদ আছে ৫ জনের, কিন্তু তিন বছর ধরে আমরা মাত্র দুজন শিক্ষক পাঠদান চালাচ্ছি। ২০১৫ সাল থেকেই প্রধান শিক্ষকের পদটি শূন্য। শিক্ষক সংকট থাকায় নানান সমস্যা হলেও আমরা নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছি। সহকারী শিক্ষক হলেও একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি আমাকে প্রশাসনিক কাজ সামলাতে হচ্ছে। কোনো কারণে একজন অসুস্থ বা ছুটিতে গেলে পুরো বিদ্যালয় চালানোর দায়িত্ব পড়ে একাই একজনের ওপর।"

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় মোট ১ হাজার ৪৭৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি বিদ্যালয়ে একজন প্রধান শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন ১ হাজার ২৪ জন। ফলে ৪৫১টি পদ শূন্য হয়ে আছে। এর মধ্যে দিরাই, ছাতক, জগন্নাথপুর, শাল্লা ও ধর্মপাশা উপজেলায় শূন্যপদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।

উপজেলাভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ রয়েছে—দিরাই ও ছাতকে ৬২টি করে, জগন্নাথপুরে ৫১টি, ধর্মপাশায় ৪২টি, শাল্লায় ৪০টি, মধ্যনগরে ৩৮টি, সুনামগঞ্জ সদরে ৩৫টি, শান্তিগঞ্জে ৩৩টি, তাহিরপুরে ৩২টি, বিশ্বম্ভরপুরে ২১টি, দোয়ারাবাজারে ২২টি এবং জামালগঞ্জে ১৩টি।

দিরাই উপজেলার মানিকদা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য আইনুল হক বলেন, "অনেক দিন ধরে আমাদের স্কুলে প্রধান শিক্ষক নেই। প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীর এই স্কুলে শিক্ষক আছেন মাত্র ৩ জন। তাদের মধ্য থেকেই একজন পাঠদানের পাশাপাশি প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। দ্রুত এখানে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।"

দীর্ঘদিন পদোন্নতি বন্ধ থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে শাল্লা উপজেলার কামারগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মিহির কান্তি দাস বলেন, "দীর্ঘদিন পদোন্নতি বন্ধ থাকায় প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। আমার শিক্ষকতার বয়স ২২ বছর হলেও এখনও পদোন্নতি পাইনি, অথচ আগে ৭-৮ বছর চাকরির পর পদোন্নতি হতো। এই বিদ্যালয়ে ৮ বছর ধরে সহকারী শিক্ষকের পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছি। বর্তমানে দুজন শিক্ষক কর্মরত থাকায় একসঙ্গে দুই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।"

শিক্ষক সংকটের প্রভাব নিয়ে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মুহিবুর রহমান বলেন, "শিক্ষক সংকট নিরসন না করে প্রাথমিক শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রধান শিক্ষক না থাকায় সহকারী শিক্ষকদের প্রশাসনিক চাপে থাকতে হয়, যা সরাসরি শ্রেণিকক্ষের পাঠদানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।"

তবে এই পরিস্থিতি নিয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহন লাল দাস জানান, দীর্ঘদিন পদোন্নতি না হওয়ায় কিছু বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। সম্প্রতি পদোন্নতি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে দ্রুতই এসব পদ পূরণ হবে। তবে তার দাবি, প্রধান শিক্ষক না থাকলেও পাঠদান বন্ধ বা ব্যাহত হচ্ছে না।

এদিকে সম্প্রতি সুনামগঞ্জে প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন বিষয়ক এক মতবিনিময় সভায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, "হাওর ও দুর্গম অঞ্চলে শিক্ষাসেবা আরও কার্যকর করতে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে সরকার। হাওরের ক্যাচমেন্ট এলাকায় স্থানীয় শিক্ষক কম পাওয়ায় অন্য এলাকা থেকে শিক্ষক দিতে হয়, যা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই সমস্যা সমাধানে কিছুটা সময় লাগলেও সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে।"