ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চারাতলা বাজারে এক অদ্ভুত ও বিস্ময়কর দৃশ্য দেখা যায়। সেখানে একটি চায়ের দোকান রয়েছে, পণ্য সাজানো আছে, চুলায় পানি ফুটছে—কিন্তু নেই কোনো দোকানদার। ক্যাশবাক্সের সামনে কেউ বসে নেই, ক্রেতাকে চা পরিবেশন করার মতো কোনো কর্মচারীও নেই। তা সত্ত্বেও দিব্যি চলছে কেনাবেচা। পথচারী বা বাজারের পরিচিত মানুষ যার যখন ইচ্ছা, নিজেই চা বানিয়ে নিচ্ছেন। কেউ কেক-বিস্কুট খাচ্ছেন, আবার কেউ অন্যদের জন্য চা তৈরি করছেন। খাওয়া শেষে হিসাব করে টাকা রেখে যাচ্ছেন দোকানে; আর যাদের কাছে সেই মুহূর্তে টাকা নেই, তারা পরে এসে পরিশোধ করেন।
মানুষের বিশ্বাস আর সততার ওপর ভিত্তি করে প্রায় চার বছর ধরে চলে আসা এই দোকানটির মালিক পাশের ভালকি গ্রামের ৬৭ বছর বয়সী সমসের আলী। তার কাছে এই দোকানটি কেবল জীবিকার উৎস নয়, বরং মানুষের প্রতি আস্থার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
গত মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) চারাতলা বাজারে দেখা যায়, দোকানটি খোলা এবং সেখানে চা, বিস্কুট ও কেক সাজানো রয়েছে। চুলায় পানি ফুটছে, তবে সেখানে উপস্থিত ব্যক্তিদের কেউই দোকানের কর্মচারী বা মালিক নন। তাদের মধ্যে একজন চা বানাচ্ছিলেন এবং বাকিরা অপেক্ষা করছিলেন। চা তৈরি হলে সবাই মিলে পান করেন এবং হিসাব অনুযায়ী টাকা রেখে চলে যান।
দোকানে আসা আশা রহমান নামে এক যুবক নিজে চা বানানোর সময় জানান, তিনি দোকানের মালিক নন। চা খেতে এসেছেন, তাই নিজেই বানিয়ে নিচ্ছেন এবং অন্যদেরও বানিয়ে দিচ্ছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন সকালে সমসের আলী দোকান খুলে প্রয়োজনীয় মালামাল সাজিয়ে দিয়ে নিজের অন্য কাজে চলে যান। দুপুরে একবার এবং রাতে আরেকবার এসে তিনি বেচাকেনার হিসাব ও টাকা সংগ্রহ করেন। দিনের দীর্ঘ সময় দোকানটি থাকে ক্রেতাদেরই দায়িত্বে।
বাজারে নিয়মিত আসা ওলিয়ার রহমান বলেন, "প্রায় প্রতিদিনই বাজারে আসি। অনেক সময় দেখি চাচা দোকানে নেই। চা খেতে ইচ্ছে করলে নিজেই বানিয়ে নিই, অন্যদেরও দিই। চা-বিস্কুটের যত টাকা হয়, হিসাব করে ক্যাশে রেখে চলে যাই। এখানে এটাই স্বাভাবিক।"
স্থানীয় মিস্ত্রি সুবীর কুমার রায় জানান, কয়েক বছর ধরে এভাবেই দোকানটি চলছে। তার ভাষায়, "এখানে কেউ চা-বিস্কুট খেয়ে টাকা না দিয়ে চলে যায়—এমন ঘটনা দেখিনি। দোকানের মালিক যখন মানুষকে বিশ্বাস করেন, ক্রেতারাও সেই বিশ্বাসের মর্যাদা দেন।"
জানা গেছে, সমসের আলী একসময় বড় পরিসরে ব্যবসা করতেন। রাইস মিলসহ কয়েকটি ব্যবসায় লোকসানের পর তিনি এই চায়ের দোকান ও কাঁচামালের ব্যবসা শুরু করেন। চারাতলা বাজারে তার একটি কাঁচামালের দোকানও রয়েছে। সেখানে সময় দিতে হয় বলে চায়ের দোকানে সারাক্ষণ থাকা সম্ভব হয় না এবং লোক নিয়োগের মতো আর্থিক সামর্থ্যও তার নেই। ফলে মানুষের ওপর আস্থাই হয়ে ওঠে তার একমাত্র ভরসা।
সমসের আলী বলেন, "প্রতিদিন সকালে এসে দোকান খুলে চুলায় পানি তুলে দিয়ে কাঁচামালের দোকানে চলে যাই। যার যখন প্রয়োজন হয়, নিজের মতো চা বানিয়ে খায় এবং টাকা রেখে যায়। আমি মানুষকে বিশ্বাস করি, মানুষও আমার বিশ্বাসের মর্যাদা রাখে।"
তিনি আরও জানান, তার এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে এবং দুজনেরই বিয়ে দিয়েছেন। শিক্ষিত ছেলে এই দোকানের দায়িত্বে আসতে আগ্রহী না হওয়ায় তিনি নিজেই এটি পরিচালনা করছেন।
তবে বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া সমসের আলী একটি বিষয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, "আমার বয়স ৬৭ বছর। গত পাঁচ বছর ধরে একটি বয়স্ক ভাতার কার্ডের জন্য ইউনিয়ন পরিষদে একাধিকবার আবেদন করেছি, কিন্তু কেউ একটি কার্ড করে দেয়নি।"
সমসের আলীর হিসাব অনুযায়ী, এই চায়ের দোকান থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। কাঁচামালের দোকান থেকেও সমপরিমাণ আয় করে কোনোমতে সংসার চালান তিনি।
বাজারের ব্যবসায়ীদের মতে, বর্তমান সময়ে যখন সামান্য বিষয়ে অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়, সেখানে দোকানদার ছাড়াই বছরের পর বছর একটি দোকান এভাবে চলা সত্যিই বিস্ময়কর। সমসের আলীর বিশ্বাস এবং ক্রেতাদের সততা চারাতলা বাজারে এক মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।