রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত সাম্প্রতিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির তথ্যে ভুল রয়েছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ। ভুল তথ্যগুলো সংশোধন করার তাগিদ দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই বিষয়ে জাতিসংঘ ব্যবস্থার অধীনে নিবন্ধিত তথ্যই সঠিক সংখ্যা প্রতিফলিত করে।
মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক (মিয়ানমার অনুবিভাগ) মো. তৌফিক-উর-রহমান বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত ইউ কিয়াও সো মোর সঙ্গে নিজ কার্যালয়ে এক বৈঠকে এই বিষয়টি উত্থাপন করেন। পরবর্তীতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই বৈঠকের বিস্তারিত জানানো হয়।
এর আগে গত শনিবার মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করেছিল, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ শরণার্থীর একটি তালিকা জুলাইয়ের শেষ নাগাদ যাচাই করা হয়েছে। মিয়ানমারের দাবি অনুযায়ী, যাচাইকৃত ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ ব্যক্তির মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন রাখাইনের বাসিন্দা। এছাড়া ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের পরিচয় যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং ৪ হাজার ২৪১ জন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন বলে দাবি করেছে মিয়ানমার সরকার। রাখাইন থেকে ১০ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার বিষয়টিও তারা অস্বীকার করেছে।
আজকের বৈঠকে মহাপরিচালক তৌফিক-উর-রহমান দুই দেশের সম্মত দ্বিপক্ষীয় কাঠামোর ভিত্তিতে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের যাচাইকরণ প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য রাষ্ট্রদূতকে অনুরোধ জানান। বৈঠকে শরণার্থীশিবিরে জন্মগ্রহণকারী শিশু এবং ২০১৭ সালের পর রাখাইন থেকে জোরপূর্বক বিতাড়িত হয়ে আসা নতুন অভিবাসীদের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়। তিনি জানান, বাংলাদেশ বর্তমানে তাঁদের নিবন্ধনের কাজ করছে এবং ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের প্রাথমিক তালিকার পর নতুন রোহিঙ্গাদের তথ্য যথাসময়ে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিনিময় করা হবে।
যাচাইকরণ প্রক্রিয়ায় এই অতিরিক্ত তথ্যগুলো সঠিকভাবে প্রতিফলিত করার অনুরোধ জানান তৌফিক-উর-রহমান। পাশাপাশি তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, রোহিঙ্গারা ‘বাঙালি’ নন, কারণ মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সম্প্রতি পর্যন্ত স্বীকৃত তাঁদের নিজস্ব জাতিগত পরিচয় রয়েছে।
বৈঠকে রাষ্ট্রদূত ইউ কিয়াও সো মোর বাংলাদেশের উদ্বেগ ও পর্যবেক্ষণগুলো তাঁর দেশের কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি যাচাইকৃত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু করতে যাচাইকরণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার বিষয়ে তাঁর সরকারের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন তিনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক তৌফিক-উর-রহমান পুনরায় ব্যক্ত করেন যে, এই সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান নিহিত রয়েছে রোহিঙ্গাদের তাঁদের নিজ ভিটেমাটি রাখাইনে নিরাপদ, সম্মানজনক ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের মধ্যে।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের নৃশংস সামরিক অভিযানের ফলে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা (বাংলাদেশের হিসাবে আট লাখের বেশি) সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এর আগে থেকেই কক্সবাজারে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছিল, যারা মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ও জাতিগত মিলিশিয়াদের সহিংসতা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিল। অন্যদিকে, মিয়ানমার সরকারের দাবি, রাখাইনে ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত হলে’ বাংলাদেশ থেকে তিন লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়া হবে।