হাবিবুল বাশারের কাছে প্রশ্ন ছিল, ‘ডারউইন টেস্টের জয়ে কোন জিনিসটা আপনার বেশি ভালো লেগেছে?’
আপাতদৃষ্টিতে সহজ প্রশ্ন মনে হলেও এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটা সহজ নয়। ভালোর তালিকাটা যে অনেক লম্বা এখানে! সেই দীর্ঘ তালিকার মধ্যে হাবিবুলের পক্ষপাত কোন দিকে, জানার চেষ্টা হয়েছিল আসলে সেটিই।
কিন্তু হাবিবুল সহজ-কঠিন কোনো পথেই হাঁটলেন না। আসলে ভালোর যে তালিকার কথা বলা হলো, সেখানে তো সবই মাঠের উপাদান! দলের সঙ্গে থাকার সূত্রে প্রধান নির্বাচকের দৃষ্টিতে এমন আরও অনেক কিছুই পড়ার কথা, ক্রিকেটারদের মাঠের পারফরম্যান্স যেগুলোর বহিঃপ্রকাশ মাত্র। আসল রহস্যটা থেকে যায় আড়ালে, ধরা পড়ে শুধু দলের কাছে থাকাদের চোখে।
প্রধান নির্বাচক সেই আড়াল থেকেই টেনে আনলেন কিছু প্রসঙ্গ, যার মূলে আছে ক্রিকেটারদের চাপহীন থাকার দৃঢ় মানসিকতা, নিজেদের ওপর আস্থায় অবিচল থাকা। বলতে পারেন, যে টেস্টের আপাদমস্তক বাংলাদেশই ভালো খেলে অস্ট্রেলিয়াকে চাপে রাখল, সেই টেস্টে আবার বাংলাদেশের চাপ আসে কোত্থেকে!
.রহস্যটা এখানেই এবং সেটা শুনুন হাবিবুলের মুখ থেকে, ‘এ ধরনের ম্যাচেও চাপ থাকে। একটি সেশন আপনি ভালো খেলছেন মানে পরের সেশনে ভালো খেলার চাপ তৈরি হওয়া। টানা ভালো খেলে যাচ্ছেন মানে সেই ভালো খেলা ধরে রাখার চাপ আসা। এই টেস্টে আমাদের ক্রিকেটাররা খুব ভালো খেলেছে, তবে আমি কৃতিত্ব দেব তাদের চাপমুক্ত থাকার মানসিকতাকে। এটাই তাদের শেষ পর্যন্ত এগিয়ে রেখেছে। তারা সব সময় টেনশন ফ্রি ছিল।’
হাবিবুল উদাহরণ হিসেবে গতকাল সকালের একটা পর্যবেক্ষণ বললেন। সেটি একটু বিস্তারিতই লেখা যাক, ‘আমরা জানি, আজকের (গতকাল) দিনটা আমাদের জন্য অন্য রকম ছিল, কিছু একটা হয়ে যেতে পারে; কিন্তু ধরুন এই জায়গায় এসে যদি না পারে, সেই চাপ তো থাকতে পারে! যদি উল্টাপাল্টা কিছু ঘটে যায়! কিন্তু সকালে হোটেলে দেখলাম, খেলোয়াড়দের মধ্যে সে রকম কিছু নেই। সবাই স্বাভাবিক, আর দশটা দিনের মতোই। ওদের এই মানসিকতাটাই ভালো লেগেছে।’
.কাল ম্যাচ শেষের সংবাদ সম্মেলনে অন্য একটা প্রসঙ্গেও অধিনায়ক নাজমুল হোসেনের মধ্যে একই রকম নির্ভার মনোভাব দেখা গেছে। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, হারারেতে সর্বশেষ টেস্টে জিম্বাবুয়ের কাছে ইনিংস হারের ঠিক পরের টেস্টেই অস্ট্রেলিয়াকে কীভাবে উড়িয়ে দেওয়া গেল? মাঝে আবার তিন দিনের প্রস্তুতি ম্যাচেও ইনিংস হার! ধারাবাহিক ব্যাটিং ব্যর্থতা মারারা স্পোর্টস কমপ্লেক্সের কোন বাঁকে এসে এতটা ‘ইউ টার্ন’ নিল? মাঠের ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়াকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিল বাংলাদেশ; কিন্তু এত জোরে তুড়িটা তারা মারল কোন শক্তি দিয়ে!
.ক্রিকেটীয় কোনো ব্যাখ্যা নেই এর। হ্যাঁ, দিন-রাত খাটাখাটনি করে আসেনি এই সাফল্য। এসেছে মনটাকে বুঝিয়ে—জিম্বাবুয়েতে খারাপ হয়েছে বলেই আমরা ভালো খেলি না, তা নয়। আমরা আমাদের ভালোটা সেখানে খেলতে পারিনি, এটাই হয়েছে সমস্যা। অস্ট্রেলিয়ায় ভালো খেলব। নাজমুলের কথার বাকিটা এ রকম, ‘জিম্বাবুয়ের ওই ম্যাচ আমাদের খেলোয়াড়দের মধ্যে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারেনি। ওটাকে কোনো সমস্যা মনে করিনি আমরা।’
.তবে প্রস্তুতিতে বিশেষ কিছু করার চেষ্টা সব সময়ই থাকে, এবারও তা ছিল। ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার নিতে এসে সে ব্যাপারে কিছুটা ধারণা দিয়েছেন হাসান মাহমুদ, ‘সতীর্থ ও কোচদের সঙ্গে বসে ভিডিও বিশ্লেষণ করে আমরা আমাদের পরিকল্পনা ঠিক করেছি। মাঠে আমরা ঠিক সেটিই বাস্তবায়ন করেছি।’
দুই ইনিংসে ৯ উইকেট নিলেও বোলারদের সাফল্যের প্রশ্নে তিনি শুধু নিজের কথাই বললেন না, ‘সব বোলারই দারুণ ধৈর্য দেখিয়েছে। তারা সঠিক প্রক্রিয়া মেনে নির্দিষ্ট লাইন-লেংথ ধরে রেখে বোলিং করে গেছে, যার সুফল দল পেয়েছে।’
আরেকটা ব্যাপার, ডারউইনে এত বড় সাফল্যের পরও বাংলাদেশ দলের ক্রিকেটাররা আনন্দের আতিশয্যে ভেসে যাননি। টেস্ট জয়ের পর মাঠেই আনন্দ-উল্লাস যা হওয়ার হয়েছে, এরপর ড্রেসিংরুমে একটু হাঁকডাক। তারপর সব শেষ। হোটেলে ফিরে যে যার নিত্যজীবনে ফিরে গেছেন। সত্যি বলতে কী, অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর পরমুহূর্ত থেকে ডারউইন-জয়ের চেয়েও ক্রিকেটারদের কাছে সবচেয়ে বড় শান্তির বিষয় হলো, ‘আজ কোনো কাজ নেই, আজ আমাদের ছুটি।’
.প্রথম ৩০ টেস্টে শূন্য জয়, সর্বশেষ ১০ টেস্টে চার—বদলে যাওয়ার এই গল্প বাংলাদেশের.ডারউইন টেস্টের আজ পঞ্চম ও শেষ দিন ছিল; কিন্তু জয়ের আনুষ্ঠানিকতা কালই শেষ হয়ে যাওয়ায় আজ ছুটি সবার। কাল সকালে ম্যাকাইয়ের ফ্লাইট, যেখানে হয়তো তাদের জন্য অপেক্ষায় আছে আরও লোভনীয় কোনো জ্যাকপট!
.বিপরীত কিছুও হতে পারে, তবে ভালোর পর আরও ভালো কিছুর আশাই তো করে মানুষ। আর ডারউইনের ভালোটা তো স্রেফ একটা টেস্ট জয়ই নয়, অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ইতিহাসেই একটা নাড়া দেওয়া। এশিয়ার টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কা আজ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ায় অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হারাতে পারেনি। পাকিস্তান সর্বশেষ এখানে টেস্ট জিতেছে ১৯৯৫ সালে। এশিয়ার দলগুলোর মধ্যে এই শতাব্দীতে এত দিন একমাত্র ভারতই ছিল, যারা অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হারাতে পেরেছে। এবার হারাল বাংলাদেশ; সেটিও এমন একসময়ে, যখন টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ের সবার ওপরে বসে আছে অস্ট্রেলিয়া।
.অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সিরিজ জয়ের স্বপ্ন দেখছেন মিরাজ