ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চারাতলা বাজারে এক অদ্ভুত ও বিস্ময়কর দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। এখানে কোনো দোকানদার ছাড়াই চার বছর ধরে চলছে একটি চায়ের দোকান। পথচারী ও বাজারের ক্রেতারাই নিজেদের ইচ্ছেমতো কেক-বিস্কুট নিচ্ছেন এবং চা বানিয়ে পান করছেন। যাওয়ার সময় প্রত্যেকেই সততার সাথে হিসাব করে টাকা রেখে যাচ্ছেন। এমনকি যাদের কাছে তাৎক্ষণিক টাকা থাকে না, তারা হিসাব কষে পরে এসে টাকা পরিশোধ করেন। বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে চলা এই দোকানে কেউ টাকা ফাঁকি দেন না।

দোকানটির মালিক পাশের ভালকি গ্রামের বাসিন্দা সমসের আলী। তিনি অন্য ব্যবসার কারণে সারাদিন দোকানে থাকতে পারেন না। প্রতিদিন সকালে এসে তিনি দোকান খুলে মালপত্র সাজিয়ে এবং চুলা জ্বালিয়ে চলে যান। এরপর দুপুরের দিকে একবার এবং রাতে একবার এসে বেচাকেনার টাকা সংগ্রহ করে দোকান বন্ধ করেন।

সম্প্রতি চারাতলা বাজারের ওই দোকানে হারুন অর রশিদ নামে ৬৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে চা বানাতে দেখা গেছে। সেখানে উপস্থিত কয়েকজন জানান, তাঁরা দোকানের মালিক নন, বরং চা পান করতে এসেছেন। একজন চা বানিয়ে অন্য সবাইকে দিচ্ছেন এবং পরে টাকা রেখে চলে যাবেন। এভাবেই দোকানটি পরিচালিত হচ্ছে।

পায়রাডাঙ্গা গ্রাম থেকে আসা মতলেব হোসেন জানান, তিনি প্রতিদিন বাজারে আসেন। তিনি বলেন, "প্রতিদিন তিনি বাজারে আসেন। এই দোকানে বেশির ভাগ সময় দোকানদার থাকেন না। চা পান করতে মন চাইলে নিজেই বানিয়ে নেন। তখন অন্য কেউ চা পান করতে চাইলে তাদেরও বানিয়ে দেন। পরে যা বিল হয়, দোকানে রেখে চলে যান।"

আফাঙ্গীর হোসেন নামের আরেকজন ব্যক্তি জানান, চার বছর ধরে দোকানটি এভাবেই চলছে। তিনি বলেন, "খেয়ে টাকা দেন না, এমন ঘটনা সাধারণত ঘটে না। দোকানের মালিক বিশ্বাস করে দোকান রেখে চলে যান। তাঁরা ক্রেতারাও খেয়ে সততার সঙ্গে টাকা রেখে যান। কেউ ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেন না।"

মালিক সমসের আলীর ভাষ্যমতে, একসময় বাজারে থাকার সময় তাঁর প্রতিদিন দুই শ টাকার ওপরে পকেট খরচ হতো, এরপর তিনি এই দোকানটি করেন। অন্য ব্যবসার ব্যস্ততা এবং দোকানে রাখার মতো লোক না থাকায় তিনি বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে দোকানটি খোলা রাখেন। তাঁর একটি ছেলে থাকলেও সে এই দোকানের দায়িত্ব নিতে চায় না। ফলে মানুষের সততার ওপর ভরসায় তিনি দোকানটি চালিয়ে যাচ্ছেন, যেখান থেকে তাঁর প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়।

বাজারের স্থানীয়দের মতে, বর্তমান সময়ে এমন ঘটনা অত্যন্ত বিরল। দোকানদারের অগাধ বিশ্বাস এবং ক্রেতাদের সততার এই মেলবন্ধন দেখে সবাই মুগ্ধ। মানুষের সততা জীবনকে কতটা সুন্দর ও সহজ করতে পারে, এই দোকানটি তার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।