গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় গাজীপুরের শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোনো কারখানায় নির্দিষ্ট ইউনিট বন্ধ রাখা হচ্ছে, কোথাও আবার শিফট ভাগ করে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চলছে। এতে কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ওভারটাইমও বন্ধ হয়েছে অনেক শ্রমিকের। দীর্ঘ সময় কাজ না থাকায় কারখানায় বসে সময় কাটাচ্ছেন তারা। এভাবে চলতে থাকলে উৎপাদন কমে গিয়ে অর্ডার হারানো এবং চাকরি হারানোর আশঙ্কা করছেন শ্রমিক ও কারখানা মালিকেরা।

শনিবার ও রোববার (১৫ ও ১৬ আগস্ট) গাজীপুরের কয়েকটি শিল্পকারখানা সরেজমিনে ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। বিশেষ করে ডাইং, ওয়াশিং ও বয়লারনির্ভর কারখানাগুলো গ্যাস সংকটে বেশি ভুগছে। কোনো কোনো কারখানা চাহিদার অর্ধেকেরও কম গ্যাস পাচ্ছে বলে জানিয়েছে।

গাজীপুরে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে দুই হাজারের বেশি পোশাক কারখানা। এসব কারখানার জেনারেটর, বয়লার ও বিভিন্ন উৎপাদন ইউনিট সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজন। তবে বর্তমানে অনেক কারখানা শূন্য থেকে ১ পিএসআই পর্যন্ত গ্যাসের চাপ পাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

কাজে নেই গতি, বাড়ছে চাকরি হারানোর শঙ্কা

সরেজমিনে দেখা যায়, গ্যাসের চাপ না থাকায় কোনো কোনো কারখানার নির্দিষ্ট ইউনিট বন্ধ রাখা হয়েছে। আবার কোথাও একসঙ্গে সব ইউনিট চালু না করে পর্যায়ক্রমে উৎপাদন করা হচ্ছে। গ্যাসের চাপ বাড়ার অপেক্ষায় শ্রমিকদের অনেককে কর্মস্থলে বসে থাকতে দেখা যায়। বিশেষ করে ডাইং বিভাগের শ্রমিকদের কাজের ওপরে প্রভাব বেশি পড়েছে।

একটি কারখানার শ্রমিক সাদিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা ডাইং সেকশনে কাজ করি। গ্যাসের চাপ থাকলে কাজ চলে, না হলে বন্ধ রাখতে হয়। গত তিন দিন ধরে ঠিকমতো কাজ করতে পারছি না। এ কারণে কারখানা শিফটভিত্তিক ছুটি দিয়েছে। এভাবে কত দিন বসে থাকব? কাজ না থাকলে বেতনও কমে যাবে। এভাবে চলতে থাকলে চাকরি হারানোরও ভয় আছে।’

বাবলি খাতুন নামে আরেক শ্রমিক বলেন, ‘গ্যাস ও বিদ্যুতের সমস্যার কারণে ওভারটাইম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। আগে রাত ৮টা পর্যন্ত, কখনও তারও বেশি সময় কাজ করতাম। এতে বাড়তি আয় হতো। এখন ওভারটাইম বন্ধ হওয়ায় আয়ও কমে গেছে। অনেক সময় বিকেল থেকেই কাজ না থাকায় বসে থাকতে হয়।’

উৎপাদন বন্ধের শঙ্কা

ওয়াশ পয়েন্ট লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার জমিস উদ্দিন বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এভাবে উৎপাদন সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়লে শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করাও কঠিন হবে। একই সঙ্গে অর্ডার হারানোর আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

সাদমা গ্রুপের পরিচালক সোহেল রানা জানান, চাহিদার তুলনায় তারা পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না। বর্তমানে গ্যাসের চাপ থাকলেও তা স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট নয়। তাদের কারখানা সচল রাখতে কমপক্ষে ৩ পিএসআই চাপ প্রয়োজন। সংকট অব্যাহত থাকলে শিল্প খাতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

স্পারো অ্যাপারেলসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শরিফুল রেজা বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দুপুর দুইটার পর চাপ কিছুটা বাড়লেও তা ৪ থেকে ৫ পিএসআইয়ের মধ্যে থাকে। এই চাপ দিয়ে স্বাভাবিক উৎপাদন চালানো সম্ভব নয়। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিংও বেড়েছে।

গ্যাস সরবরাহ কম থাকার কথা স্বীকার তিতাসের

তিতাস গ্যাসের গাজীপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক (ডিস্ট্রিবিউশন) সাইফুজ্জামান সানি বলেন, কেন্দ্রীয়ভাবে গ্যাসের চাপ কম থাকায় গাজীপুরে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম। ফলে গ্যাস লাইনের শেষ প্রান্তে থাকা কারখানাগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছে না। গ্যাসের চাপ বাড়াতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কাজ করছে।

এ বিষয়ে গাজীপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন জানান, কারখানা বন্ধের কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য তাদের কাছে নেই। তবে রিপন গার্মেন্টস নামের একটি কারখানা গ্যাসের চাপ কম থাকায় সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রেখে শ্রমিকদের ছুটি দেওয়ার নোটিশ দিয়েছে। এ ছাড়া গ্যাসের চাপ কম থাকায় আরও কিছু কারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়ার তথ্য তারা পেয়েছেন।