নোয়াখালীর বহুল আলোচিত এক ট্রিপল মার্ডার মামলায় দীর্ঘ ১০ বছর পর রায় ঘোষণা করেছে আদালত। এই রায়ে তিন আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে একজন বর্তমানে আটক থাকলেও বাকিরা পলাতক রয়েছেন।

রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুরে নোয়াখালী বিশেষ জেলা জজ আদালতের বিচারক মো. শওকত আলী এই রায় ঘোষণা করেন।

আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন— জেলা শহরের মাইজদী বাজার এলাকার কুদ্দুস উল্যাহর ছেলে ওমর নাছির সাজু ও ওমর শরিফ সুলতান এবং একই এলাকার ফারুকের ছেলে সৌরভ। এছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন একই এলাকার মৃত মফিজ উল্যাহর ছেলে কুদ্দুস উল্যাহ, নুরুল ইসলামের ছেলে ফিরোজ মাহমুদ বাপ্পি এবং মোহাম্মদ উল্যাহর ছেলে হারুন অর রশিদ বাবুল। রায় ঘোষণার সময় আদালত প্রাঙ্গণে মামলার বাদীপক্ষের স্বজন ও সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২১ মার্চ নোয়াখালী সরকারি কলেজের পুরাতন ক্যাম্পাস-সংলগ্ন এলাকায় এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটে। ওইদিন দুপুরে মাইজদী বাজার এলাকায় একটি পুকুরে কুকুর গোসল করানোকে কেন্দ্র করে স্থানীয় দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে বিষয়টি মীমাংসার জন্য সালিসে বসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সেদিন সন্ধ্যার দিকে আনোয়ার হোসেনের তিন বন্ধু ফজলে হুদা ওরফে রাজিব (২২), মো. ওয়াসিম (২৪) ও মো. ইয়াছিন (২৩) পুরাতন কলেজ ক্যাম্পাসের পূর্ব পাশের ফটকের কাছে গেলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। হামলায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ফজলে হুদা রাজিব ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। গুরুতর আহত অবস্থায় ওয়াসিম ও ইয়াছিনকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারা মারা যান।

এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর পুরো নোয়াখালীজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। নিহতদের স্বজন ও এলাকাবাসী জড়িতদের গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধন ও কর্মসূচি পালন করেন।

ঘটনার পর নিহত ফজলে হুদা রাজিবের মা কামরুন্নাহার বেগম বাদী হয়ে বেগমগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় আটজনের নাম উল্লেখ করা হয় এবং অজ্ঞাতনামা আরও সাত থেকে আটজনকে আসামি করা হয়। তদন্ত শেষে ২০১৭ সালের ৩১ মে আটজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষ্য গ্রহণসহ প্রয়োজনীয় আইনি ধাপ সম্পন্ন হয়।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর এই রায়ে নিহতদের পরিবারে স্বস্তি ফিরে এসেছে। মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট রাশেদ রায়ে বলেন, "দীর্ঘদিন ধরে পরিবারগুলো যে বিচার পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল, আজকের রায়ের মাধ্যমে সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে।" তিনি জানান, সাজাপ্রাপ্তদের মধ্যে একজন আসামি আটক থাকলেও বাকিরা পলাতক।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে মামলার বাদী কামরুন্নাহার বেগম বলেন, "আমি রায়ে সন্তুষ্ট। আমার ছেলেসহ তিনজনকে যারা হত্যা করেছে, তাদের ফাঁসির রায় হয়েছে। আমি চাই দ্রুত এই ফাঁসি কার্যকর করা হোক।"

তবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের জন্য উচ্চ আদালতে আপিলসহ পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে চূড়ান্ত সাজা কার্যকর হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হবে। অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শামসুদ্দিন এ রায় বিষয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেননি এবং তিনি সাংবাদিকদের এড়িয়ে যান।