উচ্চ আদালতের নির্দেশে দেশের নদ-নদী রক্ষায় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে (এনআরসিসি) শক্তিশালী করতে ২০২০ সালে নতুন আইন করার উদ্যোগ নেয় সরকার। এরপর ছয় বছরে আইনটির খসড়া নিয়ে হয়েছে সাতটি সভা। এরপরও আইনটি চূড়ান্ত হয়নি। সর্বশেষ গত ১২ জুলাইয়ের আন্তমন্ত্রণালয় সভায় খসড়াটি আরও পর্যালোচনার জন্য কমিশনে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি সংস্থা। ২০১৩ সালের আইনে কমিশনের ক্ষমতা মূলত সরকারি সংস্থাগুলোকে নদী রক্ষায় সুপারিশ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ। ২০১৬ সালে এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত কমিশনকে শক্তিশালী করার নির্দেশ দেন। ওই রায়ের পর কমিশনকে নদীর ‘অভিভাবক’ হিসেবেও ঘোষণা করা হয়। সেই কমিশনকে কার্যকর ক্ষমতা দিতে নতুন আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

.
প্রস্তাবিত আইনে নদী রক্ষা কমিশনের ক্ষমতা অনেকটাই বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে নদীকে ‘সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা, নদী আদালত প্রতিষ্ঠা এবং নদী-সংক্রান্ত উন্নয়নকাজ ও কারিগরি সমীক্ষা প্রকল্পের ক্ষেত্রে কমিশনের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র নেওয়ার বিধান রয়েছে।
.

ছয় বছরে সাত সভা

২০২০ সালের ডিসেম্বরে এনআরসিসি নতুন আইনের খসড়া তৈরি করে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। পরের বছরের ফেব্রুয়ারিতে খসড়াটি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এরপর ২০২২ সালের ১২ মে প্রথম আন্তমন্ত্রণালয় সভা হয়। ২০২৬ সালের ১২ জুলাই পর্যন্ত প্রস্তাবিত আইনের ওপর মোট ৭টি সভা হয়েছে। এর মধ্যে চারটি ছিল আন্তমন্ত্রণালয় সভা আর তিনটি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা সভা। সর্বশেষ ১২ জুলাইয়ের সভায়ও আইনটি চূড়ান্ত হয়নি। বিভিন্ন বিষয়ে আপত্তি ওঠার পর আরও পর্যালোচনার জন্য খসড়াটি আবার এনআরসিসিতে ফেরত পাঠিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়।

.জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের স্বায়ত্তশাসন কেন প্রয়োজন.

যে ক্ষমতা নিয়ে আপত্তি

প্রস্তাবিত আইনে নদী রক্ষা কমিশনের ক্ষমতা অনেকটাই বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে নদীকে ‘সংকটাপন্ন এলাকা’ ঘোষণা, নদী আদালত প্রতিষ্ঠা এবং নদী-সংক্রান্ত উন্নয়নকাজ ও কারিগরি সমীক্ষা প্রকল্পের ক্ষেত্রে কমিশনের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র নেওয়ার বিধান রয়েছে।

সর্বশেষ আন্তমন্ত্রণালয় সভায় তিনটি বিধানের বিষয়ে আপত্তি তুলেছে পরিবেশ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।

পরিবেশ অধিদপ্তর নদীকে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা এবং নদী আদালত প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। যুক্তি হিসেবে অধিদপ্তর বলেছে, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ২০১০ (সংশোধিত) অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তর এটি করে থাকে।

অন্যদিকে বিআইডব্লিউটিএ আপত্তি তুলেছে নদী-সংক্রান্ত প্রকল্প ও কারিগরি কাজের আগে নদী রক্ষা কমিশনের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র নেওয়ার বিধানের বিরুদ্ধে। বিআইডব্লিউটিএ বলেছে, এতে দ্বৈততা ও জটিলতা তৈরি হবে। তবে কী ধরনের দ্বৈততা ও জটিলতা তৈরি হবে, সে বিষয়ে সভার কার্যবিবরণীতে স্পষ্ট করে কিছু উল্লেখ করা হয়নি।

.
পরিবেশ আদালতে যেকোনো ধরনের দূষণ ও দখলের বিরুদ্ধে যে কেউ আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন। আলাদা করে নদী আদালত প্রতিষ্ঠা করা হলে সেটি দ্বৈততা তৈরি করবে বলে পরিবেশ অধিদপ্তর মনে করে।
ন্দকার মো. তাহাজ্জুত আলী, উপপরিচালক, আইন শাখা, পরিবেশ অধিদপ্তর
.

পরিবেশ অধিদপ্তরের আপত্তি যেখানে

প্রস্তাবিত আইনে নদীকে সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করার ক্ষমতা নদী রক্ষা কমিশনকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। সভায় সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী এ ধরনের ক্ষমতা পরিবেশ অধিদপ্তরের রয়েছে। একই ক্ষমতা নতুন করে নদী রক্ষা কমিশনকে দেওয়া হলে দুই সংস্থার মধ্যে দায়িত্বের দ্বৈততা তৈরি হতে পারে।

নদী আদালত প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও একই ধরনের আপত্তি জানিয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তর। বর্তমানে নদী দখল ও দূষণের মতো ঘটনায় প্রতিকার পেতে পরিবেশ আদালতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তাই আলাদা নদী আদালত করা হলে সেটিও দ্বৈততা তৈরি করবে বলে মত দিয়েছে সংস্থাটি। ১২ জুলাইয়ের সভার কার্যবিবরণীতেও এসব আপত্তির কথা উল্লেখ রয়েছে।

.আইনে সংজ্ঞা পাচ্ছে নদী, দখল কি ঠেকানো যাবে.

প্রস্তাবিত আইনে আপত্তির বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তমন্ত্রণালয় সভায় অংশ নেওয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের আইন শাখার উপপরিচালক খন্দকার মো. তাহাজ্জুত আলী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তরল বর্জ্যের মাধ্যমে নদীদূষণের বিষয়ে বিদ্যমান পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী পরিবেশ অধিদপ্তর ব্যবস্থা নেয়।

.

তবে নদী দখল ও নদী ভরাটের ক্ষেত্রে নদী রক্ষা কমিশনের তদারকির বিষয়টি প্রস্তাবিত আইনে থাকতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি। খন্দকার মো. তাহাজ্জুত আলী বলেন, পরিবেশ আদালতে যেকোনো ধরনের দূষণ ও দখলের বিরুদ্ধে যে কেউ আইনি প্রতিকার চাইতে পারেন। আলাদা করে নদী আদালত প্রতিষ্ঠা করা হলে সেটি দ্বৈততা তৈরি করবে বলে পরিবেশ অধিদপ্তর মনে করে।

.
প্রস্তাবিত আইনে নদীসংক্রান্ত যেকোনো উন্নয়নকাজ, কারিগরি ও কারিগরি সমীক্ষা প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে নদী রক্ষা কমিশনের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এতে আপত্তি জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ।
.

নদী উন্নয়নের কাজে এনওসি নিয়ে আপত্তি

প্রস্তাবিত আইনে নদী–সংক্রান্ত যেকোনো উন্নয়নকাজ, কারিগরি ও কারিগরি সমীক্ষা প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে নদী রক্ষা কমিশনের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। এতে আপত্তি জানিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ।

সংস্থাটির পরিচালক (বন্দর ও পরিবহন) মো. সাইফুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘প্রস্তাবিত আইনে নদী উন্নয়নসংক্রান্ত কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন বা কোনো কাজ করতে গেলে নদী কমিশনের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। আন্তমন্ত্রণালয় সভায় আমরা এর বিরোধিতা করেছি।’ তিনি বলেন, অনেক সময় জরুরি ভিত্তিতে নৌপথ ড্রেজিং বা খনন করতে হয়। নদী কমিশনের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র নিয়ে কাজ করতে গেলে অপ্রয়োজনীয় দেরি হতে পারে। এ কারণেই তাঁরা আপত্তি জানিয়েছেন।

.
নদীর নাব্যতা রক্ষা, দখল ও দূষণ রোধে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো রয়েছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থতা আছে বলেই উচ্চ আদালতের নির্দেশে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছে। সে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণ করতে হলে কমিশনের তদারক করার ক্ষমতা থাকতে হবে।
মকসুমুল হাকিম চৌধুরী, চেয়ারম্যান, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন
.

আইনে ৭৬ শতাংশ পরিবর্তন

প্রস্তাবিত আইনে বিদ্যমান জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন, ২০১৩-এর ২১টি ধারার মধ্যে ১৬টি ধারা সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে আরও ১৭টি ধারা।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, বিদ্যমান আইনের ৭৬ শতাংশ পরিবর্তন করা হচ্ছে। এ কারণেই নতুন করে আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

খসড়া আইনে কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি নদীদূষণকারী ও দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

.
২০২২ সালের ১২ মে প্রথম আন্তমন্ত্রণালয় সভা হয়। ২০২৬ সালের ১২ জুলাই পর্যন্ত প্রস্তাবিত আইনের ওপর মোট সাতটি সভা হয়েছে। এর মধ্যে চারটি ছিল আন্তমন্ত্রণালয় সভা আর তিনটি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা সভা। সর্বশেষ ১২ জুলাইয়ের সভায়ও আইনটি চূড়ান্ত হয়নি।
.

কেন এ আইন

উচ্চ আদালতের রায়ের পর সরকার ২০১৩ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন প্রণয়ন করে। পরের বছর কমিশন গঠন করা হয়। তবে বিদ্যমান আইনে কমিশনের ক্ষমতা সীমিত। নদী রক্ষায় সরকারি সংস্থাগুলোকে সুপারিশ করতে পারে কমিশন। কিন্তু সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন করানোর মতো সরাসরি ক্ষমতা নেই।

২০১৬ সালে একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত কমিশনকে শক্তিশালী করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে নদী রক্ষা কমিশনকে নদীর ‘অভিভাবক’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপরই কমিশনের ক্ষমতা বাড়াতে নতুন আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ও সরকারের জ্যেষ্ঠ সচিব মকসুমুল হাকিম চৌধুরী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, নদীর নাব্যতা রক্ষা, দখল ও দূষণ রোধে সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো রয়েছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থতা আছে বলেই উচ্চ আদালতের নির্দেশে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন গঠন করা হয়েছে। সে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণ করতে হলে কমিশনের তদারক করার ক্ষমতা থাকতে হবে।

.
প্রস্তাবিত আইনে নদী উন্নয়নসংক্রান্ত কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন বা কোনো কাজ করতে গেলে নদী কমিশনের কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। আন্তমন্ত্রণালয় সভায় আমরা এর বিরোধিতা করেছি।
মো. সাইফুল ইসলাম, পরিচালক (বন্দর ও পরিবহন), বিআইডব্লিউটিএ
.

মকসুমুল হাকিম চৌধুরী আরও বলেন, ‘কয়েকটি সংস্থা থেকে কিছু বিষয়ে আপত্তি এসেছে। আশা করি, কমিশনকে কার্যকর করার জন্য যা যা করা দরকার, সেসবসহ আইনটি পাস হবে।’