ময়মনসিংহ শহরের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ও ঐতিহাসিক সার্কিট হাউস মাঠের পাশে অবস্থিত আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল এখন চরম অবহেলায় ধ্বংসের পথে। সময়ের সাথে সাথে এই ঐতিহাসিক প্রাসাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে এবং স্থাপত্যের নান্দনিকতা হারিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের কাছে ‘লোহার কুঠি’ নামে পরিচিত এই ভবনটি একসময় ছিল মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর বাগানবাড়ির প্রধান আকর্ষণ।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কাঠ, লোহা ও টিনের সমন্বয়ে তৈরি এই দ্বিতল ভবনের সামনের ভাস্কর্যগুলো ভেঙে গেছে। লোহার অংশে ক্ষয়ের চিহ্ন স্পষ্ট এবং পেছনের বাগানটি এখন পরিচর্যাহীন। ভবনের সামনে দুটি পাথরের ভাস্কর্য থাকলেও সেগুলোর বিভিন্ন অংশ ভাঙা। একটি ভাঙা ভাস্কর্যের মাথায় শালিক পাখির বসে থাকার দৃশ্যটি যেন স্থাপনাটির বর্তমান করুণ অবস্থারই প্রতীক। নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে দ্বিতীয় তলায় ওঠার সিঁড়ির কিছু অংশ কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। এমনকি ভবনের ইতিহাস সংবলিত তথ্যফলকটিও জীর্ণ হয়ে পড়েছে।

দর্শনার্থী মনির হোসেন ও মারিয়া দম্পতির মতে, এমন ঐতিহাসিক স্থাপনা কেবল ফেলে রাখলেই হবে না, নিয়মিত সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের জন্য এর গুরুত্ব তুলে ধরা উচিত। আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থী রুহুল আমিন বলেন, “সময় পেলে মাঝেমধ্যে এখানে আসি। আলেকজান্দ্রা ক্যাসেলের সামনে দুটি পাথরের গ্রিক মূর্তি আছে, কিন্তু দুটিই অবহেলায় ভাঙা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। অযত্নে হারিয়ে যাচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী প্রাসাদের ইতিহাস। এটি বাঁচিয়ে রাখতে ভবনটির সংরক্ষণ জরুরি।”

ইতিহাস অনুযায়ী, ১৭৮৭ সালের ১ মে ময়মনসিংহ জেলা প্রতিষ্ঠার শতবার্ষিকী উপলক্ষে ১৮৮৯ সালে ২৭ দশমিক ১৫৫ একর জমির ওপর প্রাসাদটি নির্মাণ করেন মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরী। তৎকালীন ভারত সম্রাট সপ্তম এডওয়ার্ডের স্ত্রী আলেকজান্দ্রার নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় ‘আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল’। সুদূর চীন থেকে কারিগর এনে কাঠ ও লোহার সমন্বয়ে নির্মিত এই প্রাসাদের নির্মাণ ব্যয় হয়েছিল ৪৫ হাজার টাকা। একসময় এখানে ছিল নান্দনিক বাগান, দুর্লভ গাছপালা, কৃত্রিম জলাধার ও ঝরনা।

এই প্রাসাদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি। ১৯২৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহ সফরে এসে কবিগুরু এখানে চার দিন অবস্থান করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ছেলে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী, দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ইতালীয় অধ্যাপক জোসেফ তুচি।

নাগরিক ব্যক্তিত্ব আব্দুল কাদের চৌধুরী মুন্না বলেন, “এই ভবনটি কেবল পুরোনো ইট-কাঠ-লোহার স্থাপনা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত আছে জমিদারি আমলের জীবন, ঔপনিবেশিক সময়ের স্মৃতি, ময়মনসিংহের নগর-ইতিহাস এবং রবীন্দ্রনাথের সফরের মতো গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাই এটিকে যথাযথভাবে সংস্কার করা প্রয়োজন।”

পুরাকীর্তি সুরক্ষায় কমিটি ময়মনসিংহ অঞ্চলের সভাপতি ইমতিয়াজ আহমেদ তানসেন জানান, ১৩৬ বছরের পুরোনো এই ভবনটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। তিনি সতর্ক করে বলেন, সংস্কারের কাজ শুরু হওয়ার আগেই যদি আরও অংশ নষ্ট হয়ে যায়, তবে কেবল অর্থ ব্যয়ে এর আগের রূপ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না। কারণ পুরোনো স্থাপনার আসল মূল্য তার বয়স ও কারুকাজে।

পুরাকীর্তি বিশেষজ্ঞ স্বপন ধর বলেন, দ্রুত সংস্কার ও পরিকল্পিত সংরক্ষণ হলে আলেকজান্দ্রা ক্যাসেল আবারও ময়মনসিংহের গর্ব হয়ে উঠতে পারে, অন্যথায় হারিয়ে যাবে এক অমূল্য ইতিহাস। তিনি আরও জানান, দুই বছরের গবেষণায় জেলায় ৩২০টি পুরাকীর্তির তথ্য পাওয়া গেলেও ৪০টি বাড়ির আর কোনো অস্তিত্ব নেই। এ বিষয়ে সরকারের কাছে তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ময়মনসিংহের কর্মকর্তা সাবিনা ইয়াসমিন জানান, আলেকজান্দ্রা ক্যাসেলসহ ১১টি পুরাকীর্তির সংস্কার প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে এবং কাজ শুরু হলে এটি দর্শনার্থীদের উপযোগী হবে। অন্যদিকে, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক আফরোজা খান মিতা বলেন, “২০১৮ সালের ৮ মার্চ আলেকজান্দ্রা ক্যাসেলকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রত্নস্থলগুলোর সংস্কার, সংরক্ষণ ও উন্নয়ন শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় এই ভবনটি সংস্কার ও সংরক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে।”