টেলিযোগাযোগ সেবায় তরঙ্গকে কেবল সরকারি রাজস্ব সংগ্রহের মাধ্যম হিসেবে না দেখে জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করার দাবি জানিয়েছেন খাতের বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের মতে, সাশ্রয়ী মূল্যে অধিক স্পেকট্রাম বরাদ্দ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন করা গেলে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে।

শনিবার সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি)-এর আয়োজনে ‘স্পেকট্রাম ফর আ কানেকটেড বাংলাদেশ: এনাব্লিং ইন্টারনেট ফর অল’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে আলোচকেরা এই আহ্বান জানান।

বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের সব মোবাইল অপারেটর মিলে মোট ৪৬৩ মেগাহার্টজ তরঙ্গ ব্যবহার করছে। এর মধ্যে আগামী নভেম্বরের মধ্যে তিনটি বেসরকারি অপারেটরকে মোট ৭৯ দশমিক ২ মেগাহার্টজ তরঙ্গ নবায়ন করতে হবে। যার মধ্যে গ্রামীণফোনের ৩২ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ, রবির ২৯ দশমিক ৪ এবং বাংলালিংকের ২১ মেগাহার্টজ তরঙ্গ নবায়নের সময়সীমা শেষ হবে।

বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, “তরঙ্গ নবায়ন বিষয়ে অযৌক্তিক কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। নেটওয়ার্কের মান, ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক মডেল, সেবার সক্ষমতা ও গ্রাহকের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়েই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে।” তিনি সংশ্লিষ্টদের উদ্বিগ্ন না হয়ে বাস্তব পরিস্থিতি ও জনগণের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, “তরঙ্গের মূল্য নির্ধারণে এককালীন রাজস্ব আয়ের বদলে গ্রাহকসেবা, অপারেটরদের ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ ‘সুইট পয়েন্ট’ খুঁজে বের করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।” তিনি আরও জানান, টেলিকম নীতি ও তরঙ্গের দাম নির্ধারণে অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত নয়, বরং গভীর বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে ভিত্তি হিসেবে নেওয়া হবে।

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন টেলিযোগাযোগবিষয়ক পরামর্শক মুনির হাসান। প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালে মোবাইল নেটওয়ার্ক পারফরম্যান্সে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ৯৩তম। তরঙ্গের মূল্য অতিরিক্ত বেশি হলে অপারেটরদের মূলধনের বড় অংশ নেটওয়ার্ক বিনিয়োগের পরিবর্তে ফি পরিশোধেই ব্যয় হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রার বহিঃপ্রবাহ বাড়িয়ে দেয়। বিপরীতে সাশ্রয়ী মূল্যে দ্রুত তরঙ্গ বরাদ্দ দেওয়া গেলে নেটওয়ার্কের মান বাড়বে এবং ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের সভাপতি জিয়াদ সাতারা বলেন, “তরঙ্গের প্রকৃত মূল্য শুধু সরকারের রাজস্ব আয়ের ভিত্তিতে পরিমাপ করা উচিত নয়; বরং এর মাধ্যমে যে উন্নত সংযোগ, বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়, সেই ভিত্তিতেই এর মূল্যায়ন হওয়া উচিত।”

গ্রামীণফোন সিইও ইয়াসির আজমান বলেন, “তরঙ্গ নবায়নের বিষয়টিকে আরও বিস্তৃত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। সঠিক সমাধান ও করণীয় নির্ধারণে সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।”

অন্যদিকে, বাংলালিংক সিইও ইয়োহান বুসে বলেন, “সাশ্রয়ী মূল্যে তরঙ্গ বরাদ্দ দেওয়া গেলে সেবার মান বাড়বে, বিনিয়োগ বাড়বে ও দেশের উন্নয়ন হবে।”

টিআরএনবির সভাপতি এস এম মাসুদুজ্জামান রবিনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে আরও বক্তব্য রাখেন অ্যামটব মহাসচিব মোহাম্মদ জুলফিকার, রবির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম এবং বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন টিআরএনবির সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসাইন।