সকাল থেকে কম্পিউটারের সামনে বসে কাজ করা অনেকের জন্য একটি সাধারণ অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঝে মাঝে চা বা কফির জন্য ওঠা, দুপুরে খাবারের সময় কিছুক্ষণ হাঁটা, এরপর আবার একই চেয়ার। দিনের শেষে যখন চেয়ার থেকে উঠছেন, তখন ঘাড় শক্ত, কাঁধে টান এবং কোমরে ব্যথা অনুভব করা একটি পরিচিত দৃশ্য।

দীর্ঘ সময় বসে থাকা এখন শুধু বয়স্কদের সমস্যা নয়, তরুণদের মধ্যেও ঘাড়, কাঁধ, পিঠ ও কোমরের ব্যথা বাড়ছে। এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে বসে থাকা, ভুল বসার অভ্যাস এবং কাজের জায়গার অস্বাস্থ্যকর বিন্যাস।

একটি প্রতিবেদনে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা পর্যন্ত কম্পিউটার বা ল্যাপটপের সামনে বসে কাজ করার সঙ্গে এসব সমস্যার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। তবে শুধু ডেস্কে বসে থাকাই সমস্যা নয়। কীভাবে বসছেন, স্ক্রিন কোথায় রাখা, চেয়ার কেমন এবং দিনের মধ্যে কতটা নড়াচড়া করছেন, সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে কেন ব্যথা হয়? শরীরকে একই অবস্থায় দীর্ঘ সময় ধরে রাখলে ঘাড়, কাঁধ, পিঠ ও কোমরের পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে। বিশেষ করে সামনে ঝুঁকে কম্পিউটারে কাজ করার সময় মেরুদণ্ডের ওপর চাপ বাড়তে পারে। দীর্ঘ সময় এমন ভঙ্গিতে থাকলে অস্বস্তি ও ব্যথা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

অনেকেই কাজের সময় খেয়াল না করেই মাথা সামনে নিয়ে আসেন, কাঁধ সামনের দিকে ঝুলিয়ে রাখেন বা কোমর বাঁকিয়ে বসেন। শুরুতে হয়তো তেমন কিছু মনে হয় না, কিন্তু দিনের পর দিন একই ভঙ্গি চলতে থাকলে পেশি ও মেরুদণ্ডের ওপর চাপ জমতে থাকে।

ল্যাপটপে কাজ করলে সমস্যা বেশি হতে পারে। ল্যাপটপের স্ক্রিন ও কিবোর্ড একসঙ্গে যুক্ত থাকায় স্ক্রিন চোখের সমান উচ্চতায় তুলতে গেলে কিবোর্ড ব্যবহারে অসুবিধা হতে পারে। ফলে অনেকেই স্ক্রিন দেখার জন্য মাথা নিচু করে বসেন। দীর্ঘ সময় এভাবে থাকলে ঘাড়ের পেশিতে টান তৈরি হতে পারে।

সম্ভব হলে দীর্ঘ সময়ের ডেস্ককাজে আলাদা মনিটর বা ল্যাপটপ স্ট্যান্ড ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে স্ক্রিন চোখের কাছাকাছি স্বাভাবিক উচ্চতায় রাখা সহজ হয়।

আমাদের পেট ও পিঠের পেশি মেরুদণ্ডকে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু দিনের বেশির ভাগ সময় বসে কাটালে শরীরের এসব পেশি পর্যাপ্তভাবে সক্রিয় থাকে না।

দেওয়া প্রতিবেদনে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার সঙ্গে পেট ও পিঠের পেশি দুর্বল হয়ে মেরুদণ্ড ও কোমরের ওপর চাপ বাড়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এ কারণে শুধু ব্যথা হলে বিশ্রাম নেওয়া যথেষ্ট নয়। নিয়মিত হাঁটা, উপযুক্ত ব্যায়াম এবং পেশির শক্তি ও নমনীয়তা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘক্ষণ চেয়ারে বসে থাকার সময় কোমর ও উরুর সংযোগস্থলের হিপ ফ্লেক্সর পেশিগুলো দীর্ঘ সময় সংকুচিত অবস্থায় থাকে। নিয়মিত নড়াচড়া না করলে এই অঞ্চলে শক্তভাব তৈরি হতে পারে।

ফলে দাঁড়ানোর সময় বা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার পর হাঁটতে গেলে কোমরের নিচের অংশে টান বা অস্বস্তি অনুভূত হতে পারে। চিকিৎসা সংস্থাগুলোও দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে কোমর ও পিঠে চাপ বাড়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছে।

অনেকে ডেস্কে কাজ করার সময় শুধু কম্পিউটার বা ল্যাপটপের অবস্থানের দিকে নজর দেন। কিন্তু চেয়ারও সমান গুরুত্বপূর্ণ। চেয়ার খুব নিচু হলে ডেস্কের দিকে তাকানোর সময় শরীরের ভঙ্গি বদলে যেতে পারে। আবার চেয়ার খুব উঁচু হলে পা ঠিকভাবে মেঝেতে না-ও রাখতে পারেন। এতে শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।

চেয়ারে বসার সময় পিঠের জন্য পর্যাপ্ত সাপোর্ট থাকা ভালো। পা মেঝেতে স্বাভাবিকভাবে রাখা এবং শরীরকে সামনের দিকে বেশি ঝুঁকিয়ে না বসার চেষ্টা করা উচিত।

কম্পিউটারের স্ক্রিন এমন জায়গায় রাখা ভালো, যাতে কাজ করার সময় মাথা বারবার নিচু বা উঁচু করতে না হয়। চোখের সামনে স্বাভাবিক উচ্চতায় স্ক্রিন রাখা ঘাড়ের ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে।

ল্যাপটপে কাজ করার সময় প্রয়োজন হলে স্ট্যান্ড ব্যবহার করতে পারেন। দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহার করলেও একই বিষয় মনে রাখা দরকার। ফোনের দিকে নিচু হয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকা ঘাড়ের পেশিতে বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।

ডেস্কের চেয়ার যত ভালোই হোক, ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই অবস্থায় বসে থাকা ভালো নয়। দেওয়া প্রতিবেদনে প্রতি ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট পর উঠে কিছুক্ষণ হাঁটা বা নড়াচড়া করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

অন্য স্বাস্থ্যসূত্রগুলোও দীর্ঘ সময় বসে থাকার মধ্যে নিয়মিত বিরতি নেওয়ার ওপর জোর দেয়। Johns Hopkins Medicine-এর পরামর্শ অনুযায়ী, প্রায় ৩০ মিনিট পরপর উঠে একটু হাঁটা বা অবস্থান পরিবর্তন করা যেতে পারে।

বিরতি মানেই ১০ মিনিটের জন্য আলাদা করে ব্যায়াম করতে হবে, এমন নয়। ডেস্ক থেকে উঠে পানি নেওয়া, একটু হাঁটা, দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলা বা কয়েক মিনিট শরীর নড়াচড়া করাও উপকারী হতে পারে।

একটি আরামদায়ক ও স্বাস্থ্যকর ডেস্ক সেটআপের জন্য কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখতে পারেন। চেয়ার এমন হওয়া উচিত যাতে পিঠ ও কোমর পর্যাপ্ত সাপোর্ট পায়, পা মেঝেতে স্বাভাবিকভাবে রাখুন, কাঁধ যেন অযথা উঁচু হয়ে না থাকে, কিবোর্ড ও মাউস এমন জায়গায় রাখুন যাতে হাত অতিরিক্ত সামনে বাড়াতে না হয় এবং মনিটর চোখের সামনে স্বাভাবিক উচ্চতায় রাখুন।

শুধু অফিসে বসার ভঙ্গি ঠিক করলেই হবে না। দিনের অন্য সময় শরীরকে সক্রিয় রাখাও প্রয়োজন। নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম পিঠ ও ঘাড়ের পেশির শক্তি এবং নমনীয়তা বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।

হাঁটা, সাঁতার, উপযুক্ত স্ট্রেচিং বা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করা যেতে পারে। তবে দীর্ঘদিনের ব্যথা থাকলে নিজের ইচ্ছায় কঠিন ব্যায়াম শুরু না করে চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

বিশেষ করে অনেক দিন ব্যায়াম না করে হঠাৎ খুব কঠিন ব্যায়াম শুরু করলেও পিঠে ব্যথা হতে পারে।

সব ধরনের ব্যথার ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। হালকা শক্তভাব বা দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে হওয়া সাধারণ অস্বস্তিতে অবস্থান পরিবর্তন, হালকা নড়াচড়া ও উপযুক্ত স্ট্রেচিং উপকারী হতে পারে।

কিন্তু ব্যথা খুব বেশি হলে বা ব্যথার সঙ্গে হাত-পায়ে অবশভাব, ঝিনঝিনি, দুর্বলতা কিংবা ব্যথা ছড়িয়ে পড়ার মতো উপসর্গ থাকলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।

ডেস্কে কাজ করার পর সামান্য ব্যথা হলেই চিকিৎসকের কাছে ছুটতে হবে, এমন নয়। কিন্তু নিচের পরিস্থিতিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো- ব্যথা কয়েক দিনেও না কমলে, ব্যথা ক্রমশ বাড়তে থাকলে, ঘাড়ের ব্যথা হাত বা পায়ে ছড়িয়ে পড়লে, হাত বা পায়ে অবশভাব বা ঝিনঝিনি হলে, হাত-পায়ে দুর্বলতা দেখা দিলে, আঘাতের পর তীব্র ঘাড় বা পিঠে ব্যথা হলে এবং ব্যথার কারণে দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হলে।

তীব্র ব্যথা বা আঘাতের পর শুরু হওয়া ঘাড়ের ব্যথার ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।

ডেস্ক জব হলেও সুস্থ থাকা সম্ভব। ডেস্কে কাজ করতেই হবে বলে ঘাড়, পিঠ বা কোমরের ব্যথাকে জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে মেনে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। সমস্যার বড় অংশ তৈরি হয় দীর্ঘ সময় একই ভঙ্গিতে থাকা, ভুলভাবে বসা এবং পর্যাপ্ত নড়াচড়া না করার কারণে।

তাই কাজের মাঝখানে নিয়মিত বিরতি নেওয়া, চেয়ার ও স্ক্রিনের অবস্থান ঠিক করা, শরীরকে সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে না বসা এবং প্রতিদিন কিছুটা শরীরচর্চার অভ্যাস করা গুরুত্বপূর্ণ।

সবচেয়ে সহজ নিয়মটি হলো, শুধু বসার ভঙ্গি নয়, বসে থাকার সময়টাও কমান। কারণ ভালো চেয়ারেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই অবস্থায় বসে থাকা শরীরের জন্য আদর্শ নয়। নিয়মিত অবস্থান পরিবর্তন, হাঁটা ও শরীরকে সক্রিয় রাখাই ডেস্ককর্মীদের ঘাড়, পিঠ ও কোমরের সুস্থতা ধরে রাখার অন্যতম সহজ উপায়।