গ্যাস সরবরাহে তীব্র সংকটের মুখে শেরপুর শহর ও আশপাশের এলাকার হাজারো আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহক চরম ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। গত তিন দিন ধরে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির গ্রাহকেরা স্বাভাবিকভাবে গ্যাস পাচ্ছেন না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকে মাটির চুলা, বৈদ্যুতিক চুলা অথবা অতিরিক্ত দামে এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করে রান্না করছেন। কেউ কেউ হোটেল থেকে খাবার কিনে জীবনযাপন করছেন।
তিতাস গ্যাসের শেরপুর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলা শহরে আবাসিক গ্রাহক রয়েছেন চার হাজার ২৩০ জন এবং সিএনজি পাম্পসহ বাণিজ্যিক গ্রাহক রয়েছে ২১টি। প্রতি মাসে এই জেলায় ২৮ থেকে ৩২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়, যার প্রায় ৪০ শতাংশ ব্যয় হয় জেলার একমাত্র সিএনজি পাম্পে।
জানা গেছে, বুধবার রাত থেকে মূলত এই সংকটের শুরু। বৃহস্পতিবার গ্যাস সরবরাহ থাকলেও চাপ ছিল মাত্র ৬ থেকে ৭ পিএসআই। তবে শুক্রবার সকাল থেকে গ্যাসের চাপ একেবারেই পাওয়া যায়নি, যার ফলে শহরের অধিকাংশ বাসাবাড়িতে চুলা জ্বলেনি। শনিবার সকালে কিছু এলাকায় সামান্য চাপ পাওয়া গেলেও কোথাও কোথাও কেবল একটি চুলা জ্বলতে দেখা গেছে। উল্লেখ্য, স্বাভাবিক সময়ে এই জেলায় গ্যাসের চাপ থাকে ২০ থেকে ২১ পিএসআই, যা কখনো কখনো ২২ থেকে ২৩ পিএসআই পর্যন্ত পৌঁছায়।
শুক্রবার সন্ধ্যা ও শনিবার সকালে শহরের কসবা, গৃদ্দানারায়ণপুর, মধ্যশেরী, মাধবপুর, মুন্সিবাজার, গৌরীপুর, খরমপুর, সিংপাড়া, রাজাবাড়ি, পূর্ব রাজাবাড়ি, রঘুনাথবাজার ও বাগবাড়ি এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, গ্যাস নেই বললেই চলে। কোথাও কোথাও গ্যাস থাকলেও চাপ ছিল অত্যন্ত কম, যা রান্নার ক্ষেত্রে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
শহরের শিববাড়ী মহল্লার বাসিন্দা ঝুমন চন্দ্র দে বলেন, "আমার দুটি চুলা। শুক্রবার কোনো চুলাতেই গ্যাস পাইনি। তবে আজ একটি চুলায় কিছুটা চাপ আছে, কিন্তু তা একেবারেই কম। রান্না করতে অনেক সময় লাগছে।"
সবজরখিলা মহল্লার গৃহিণী শিউলি আক্তার বলেন, "গত ৩ দিন ধরে সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। রাত ১১টার পর যেটুকু আসে, তাতেও চুলা ঠিকমতো জ্বলে না। কষ্ট করে রাতে রান্না করে দিনে খেতে হয়। কিন্তু শুক্রবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কোনো গ্যাসই ছিল না।"
একই ভোগান্তির কথা জানান খরমপুর এলাকার গৃহিণী আসমা খাতুন। তিনি বলেন, "বুধবার রাত থেকে গ্যাসের চাপ কমতে শুরু করে। সাময়িক সমস্যা ভেবে দুই দিন চুলা জ্বালাতে না পেরে হোটেল থেকে খাবার এনে খেয়েছি। কিন্তু শুক্রবার একেবারেই গ্যাস না থাকায় বাধ্য হয়ে মাটির চুলায় অল্প পরিসরে রান্না করছি।"
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে বাণিজ্যিক সংযোগ থাকা হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোতেও। শেরপুরের নিউমার্কেট এলাকার আদি গিরিশ হোটেলে প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাসের চুলায় রুটি ভাজা হলেও শুক্রবার সারা দিন এই কাজ বন্ধ রাখতে হয়েছে।
হোটেলটির শ্রমিক সঞ্চয় সাহা বলেন, "বুধবার ও বৃহস্পতিবার অল্প গ্যাসে রুটি ভাজতে বেশি সময় লেগেছে। কিন্তু শুক্রবার সারা দিন গ্যাস না থাকায় চুলা বন্ধ রাখতে হয়েছে। ফলে ক্রেতাদের রুটি দিতে না পারায় অনেকেই ফিরে গেছেন।"
এই বিষয়ে শেরপুর তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন ও ডিস্ট্রিবিউশন অফিসের ম্যানেজার প্রকৌশলী মো. বদরুজ্জামান বলেন, "মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় এই সংকট দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ৮টা থেকেই সংকট তীব্র হয় এবং শুক্রবার গ্যাসের চাপ শূন্যে নেমে আসে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে চার থেকে পাঁচ দিন সময় লাগতে পারে।"