কুষ্টিয়ার মিরপুরে ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য আরিফুল ইসলামকে ফাঁসানোর পরিকল্পনা করে উল্টো নিজেরাই পুলিশের জালে পড়েছেন ডেকোরেটর ব্যবসায়ী আশিক আলী ও তার দুই সহযোগী। অস্ত্র আইনে দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত আশিক আলী, তার কর্মচারী কালু এবং মালিহাদ গ্রামের আব্দুল মজিদকে গত বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার করে পুলিশ। শুক্রবার (১৪ আগস্ট) রাতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর রাত নয়টার দিকে তাদের কুষ্টিয়া জেলা কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ছাতিয়ান নওদাপাড়া কুর্শা গ্রামের ইউপি সদস্য আরিফুল ইসলামের সঙ্গে ডেকোরেটর ব্যবসা নিয়ে আশিক আলীর দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। গত ১১ আগস্ট রাত ১২টায় আশিক পুলিশকে ফোন করে জানান, আরিফুল ইসলামের বাড়ির পাশে ভুট্টার পালার মধ্যে মাদক ও অস্ত্র রাখা আছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে ওই দিন রাত দুইটার দিকে মিরপুর থানা-পুলিশ অভিযান চালিয়ে একটি ওয়ান শুটার গান, এক রাউন্ড গুলি ও দুটি ককটেলসদৃশ বস্তু উদ্ধার করে এবং আরিফুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে।
ঘটনার পর মিরপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মাহমুদুর রহমান বাদী হয়ে মামলা করেন এবং তদন্তের দায়িত্ব পান উপপরিদর্শক (এসআই) এস এম এলিস মাহমুদ। তবে আরিফুলকে গ্রেপ্তারের পর স্থানীয়দের প্রতিবাদ এবং তদন্তে কিছু অসংলগ্ন বিষয় সামনে আসায় পুলিশের সন্দেহ হয়। পুনরায় তদন্ত করে পুলিশ জানতে পারে, ইউপি সদস্যকে ফাঁসানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে ওই অস্ত্র ও বিস্ফোরক রাখা হয়েছিল। সত্যতা স্পষ্ট হওয়ার পর আটকের পরদিন আরিফুলকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার দুই-তিন দিন আগে আশিক তার কর্মচারী কালুকে একটি অস্ত্র সংগ্রহ করতে বলেন। কালু মালিহাদ গ্রামের আব্দুল মজিদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং আশিকের কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা নিয়ে ১৪ হাজার টাকায় একটি ওয়ান শুটার গান, এক রাউন্ড গুলি ও দুটি ককটেলসদৃশ বস্তু সংগ্রহ করেন।
পুলিশের ভাষ্যমতে, ২০২৩ সালে স্থানীয় একটি মাহফিলে আশিক আলীর ডেকোরেটর ভাড়া না করায় তিনি ক্ষুব্ধ হন। ওই মাহফিলে অন্য এলাকার একটি ডেকোরেটর ব্যবহার করা হয়েছিল। আশিকের ধারণা ছিল, তার ব্যবসা না চলার পেছনে ইউপি সদস্য আরিফুল ইসলামের ভূমিকা রয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালের পর থেকে ব্যবসায় মন্দা আসায় তিনি আরিফুলকে শায়েস্তা করার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ঘটনার রাতে আশিক একটি লাল ব্যাগে মুড়িয়ে অস্ত্র ও ককটেল আরিফুলের বাড়ির পাশে রেখে আসেন এবং পুলিশকে ভুয়া তথ্য দিয়ে ফোন করেন।
পুলিশ প্রথমে আব্দুল মজিদকে আটক করে, এরপর তার তথ্যে কালু এবং সবশেষে মূল পরিকল্পনাকারী আশিক আলীকে বৃহস্পতিবার দুপুর ২টায় গ্রেপ্তার করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আশিক আলীর বাবা আমজাদ হোসেন বোরহান প্রবাসফেরত এবং স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বিগত সরকারের সময়ে এলাকায় অনুষ্ঠানে আশিকের ডেকোরেটর নেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হতো বলে তারা দাবি করেন।
ভুক্তভোগী ইউপি সদস্য আরিফুল ইসলাম বলেন, “২০২৩ সালে আমাদের এলাকায় একটি ইসলামি মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছিল। ওই মাহফিলে আশিকের ডেকোরেটর ব্যবহার না করে আলমডাঙ্গা থেকে ডেকোরেটর আনা হয়। এতে আশিক ক্ষুব্ধ হন এবং মাহফিলটি রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে পুলিশ এনে বন্ধ করে দেন। ধর্মীয় বিষয়ে এমন আচরণ করায় এলাকার মানুষ তার ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়। এরপর থেকে গ্রামের মানুষ তাকে দিয়ে ডেকোরেশনের কাজ খুব একটা করাত না। এ নিয়ে পরে তার সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। সেই বিরোধের জেরেই আমাকে অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে।”
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আশিক আলী বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) এস এম এলিস মাহমুদ বলেন, “অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনার পর অনেক অসংলগ্ন বিষয় সামনে আসতে থাকে। অভিযানের সময় আশিক আলী আমাদের সামনে থাকলেও আমরা তখন তাকে আটক করিনি। একটু ঝুঁকি নিয়েছিলাম। প্রথমে আব্দুল মজিদকে আটক করি, এরপর কালুকে এবং তার দেওয়া তথ্যে আশিককে গ্রেপ্তার করা হয়। মূলত পূর্বশত্রুতার জের ধরেই আরিফুলকে অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। গ্রেপ্তার তিনজনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।”
মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম জানান, ইউপি সদস্যকে অস্ত্র মামলায় ফাঁসানোর ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন এবং আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।