গ্যাস সংকটের প্রভাবে ফেনী জেলায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে দুই থেকে তিনগুণ বেশি ভাড়া আদায় করায় চরম ভোগান্তির মুখে পড়েছেন সাধারণ যাত্রী ও অফিসগামী মানুষ। অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে চালকদের সঙ্গে যাত্রীদের কথা-কাটাকাটির ঘটনাও ঘটছে।

গত বুধবার থেকে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (বিজিডিসিএল) গ্যাস স্টেশন থেকে কিছু এলাকায় স্বল্প এবং অনেক এলাকায় পুরোপুরি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে জেলার প্রায় সব সিএনজি ফিলিং স্টেশন গ্রাহকের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে।

বিজিডিসিএল কর্তৃপক্ষ এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর প্রভাবে কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও চাঁদপুরসহ বিভিন্ন বিতরণ এলাকায় গ্যাসের স্বল্পচাপ এবং কোনো কোনো এলাকায় পুরোপুরি শূন্য চাপ বিরাজ করছে। এই সাময়িক অসুবিধার জন্য বিজিডিসিএল কর্তৃপক্ষ আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে।

বিজিডিসিএল ফেনী কার্যালয়ের বিক্রয় শাখার ব্যবস্থাপক কিরণ শংকর পাল মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "জাতীয় গ্রিড থেকে গ্যাস না আসায় ফিলিং স্টেশনসহ প্রায় সব শ্রেণির গ্রাহকই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে দেশীয় গ্যাসফিল্ডগুলোর সরবরাহ অব্যাহত থাকায় কিছু এলাকায় অতি সীমিত পরিসরে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।"

সরেজমিনে দেখা গেছে, গ্যাস সংকটে ফিলিং স্টেশনগুলোতে অটোরিকশার দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। মাঝেমধ্যে গ্যাস এলেও তা অপ্রতুল হওয়ায় সব গাড়ির চাহিদা পূরণ হচ্ছে না, যার ফলে সড়কে অটোরিকশার সংখ্যা কমে এসেছে। যেসব গাড়ি গ্যাস পাচ্ছে, সেগুলোতে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

শহরের মহিপাল থেকে ট্রাংক রোড, হাসপাতাল মোড়, বড় মসজিদ থেকে লালপোল এবং জেলার দাগনভূঞা, ছাগলনাইয়া, সোনাগাজী, পরশুরাম ও ফুলগাজী রুটে চলাচলকারী পরিবহনগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ঘটনা দেখা গেছে। স্বাভাবিক সময়ে যে দূরত্বের ভাড়া ১০ থেকে ১৫ টাকা, সেখানে বর্তমানে ৩০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে।

দাগনভূঞার রামনগর ইউনিয়নের সেকান্তপুরের বাসিন্দা জামাল উদ্দিন মহিপাল থেকে দাগনভূঞা যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও কোনো গাড়ি পাচ্ছিলাম না। শেষে বাধ্য হয়ে একটি অটোরিকশায় উঠতে চাইলাম, কিন্তু চালক ভাড়া চাইল দ্বিগুণ; না দিলে গাড়িতে উঠতে নিষেধ করে দিয়েছে।"

তিনি আরও বলেন, "গ্যাস নেই সেটা আমরাও জানি। কিন্তু তাই বলে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে এমন গলাকাটা ভাড়া নেওয়া কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না। একচেটিয়া ভাড়া বৃদ্ধিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষের নাভিশ্বাস উঠেছে। আমরা এ বিষয়ে প্রশাসনের পদক্ষেপ আশা করছি।"

ভাড়া বৃদ্ধির বিষয়ে চালকরা ভিন্ন যুক্তি দিয়েছেন। তাদের দাবি, গ্যাসের জন্য পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। ভোররাতের দিকে কিছুটা গ্যাস এলেও তা দ্রুত শেষ হয়ে যায়। মহিপাল-দাগনভূঞা রুটের চালক নজরুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "২৪ ঘণ্টা পাম্পের লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও গ্যাস পাচ্ছি না। ভোররাতের দিকে একটু গ্যাস পাওয়া যায়। তখন তো গাড়ি চালানোর সময় পাওয়া যায় না। মালিককে জমা দিতে হয়, পরিবারের পেট চালাতে হয়। বাধ্য হয়ে গাড়ি চালাচ্ছি। খরচ ওঠাতেই একটু বেশি ভাড়া নিতে হচ্ছে।"

শহরের নজির আহমেদ ফিলিং স্টেশনে অপেক্ষারত চালক মিলন হোসেন ইসলাম বলেন, গ্যাস না থাকার কারণে গাড়ি বাড়িতে নিয়ে যাওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। মালিকের জমা ও সংসারের খরচ চালানো নিয়ে তিনি অনিশ্চয়তার কথা জানান।

ফেনী জেলা সিএনজিচালিত অটোরিকশা মালিক সমিতির সভাপতি মওদুদ আহমদ রনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "ফেনীতে প্রায় ১৫ থেকে ১৬ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা চলাচল করে। অনেকে বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডার কিনে গাড়ি চালাচ্ছেন, যা দ্রুত শেষ হয়ে যায়। এ কারণে অনেক চালক বাড়তি ভাড়া নিচ্ছেন। গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক হলে বাড়তি বাড়ার অভিযোগ থাকবে না।"

বিজিডিসিএল ফেনী কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ফেনী, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলায় প্রতিদিন প্রায় ২৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১২ থেকে ১৪ মিলিয়ন ঘনফুট। ফেনীতে বিজিডিসিএলের আওতায় প্রায় ২৫ হাজার আবাসিক গ্রাহক (শহরে ১৯ হাজার), ১২টি সিএনজি ফিলিং স্টেশন, প্রায় ২৯টি শিল্পকারখানা এবং ৭টি ক্যাপটিভ পাওয়ার ইউনিট এই সংকটের শিকার হয়েছে।

স্টার লাইন ফিলিং স্টেশনের ম্যানেজার বিপুল শর্মা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "আমাদের তিনটি স্টেশনে প্রতিদিন ১১ থেকে ১২ হাজার ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকে। বুধবার থেকে সরবরাহ কার্যত বন্ধ। কর্তৃপক্ষের আভাস অনুযায়ী পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।"

বিজিডিসিএল সঞ্চালন বিভাগের ব্যবস্থাপক দেওয়ান মোস্তফা ইমরান জানান, টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে এই জাতীয় সংকট তৈরি হয়েছে। জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরিস্থিতি পুরোপুরি ঠিক হওয়ার নির্দিষ্ট সময় বলা সম্ভব নয়।

ফেনীর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফাতিমা সুলতানা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "বাড়তি ভাড়া নেওয়ার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা এ বিষয়ে মালিক সমিতিকে সহনশীলভাবে ভাড়া আদায়ের নির্দেশনা দিয়েছি। জেলা প্রশাসন থেকে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে।"