সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকায় এক দরিদ্র ঘরে স্বামী-স্ত্রীর সংসার থেমে গেছে। ঘরের বারান্দার এক কোণে বসে রয়েছেন ভূমিকা জলদাস। কখনো কাঁদছেন, কখনো লুটিয়ে পড়ছেন। স্বামীর নাম ধরে বিলাপ করছেন তিনি।

গতকাল শুক্রবার এই ঘর থেকেই কাজে বেরিয়েছিলেন তাঁর স্বামী পলাশ জলদাস। কয়েক ঘণ্টা পর খবর আসে, তিনি আর বেঁচে নেই। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের একটি জাহাজভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় মৃত্যু হয়েছে শ্রমিক পলাশের।

পলাশ ও ভূমিকার ঘর সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকায়। সেখান থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে সাগরের উপকূলে ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ও রিসাইক্লিং ইয়ার্ড। গতকাল সকাল সাতটার দিকে ওই কারখানায় কাজে গিয়েছিলেন শ্রমিক পলাশ। স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় ‘বিষাক্ত গ্যাসের’ প্রভাবে তিনিসহ ৯ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। অসুস্থ আরও তিনজন।

ভূমিকা এখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। মাস দুয়েক পর তাঁদের প্রথম সন্তান পৃথিবীতে আসার কথা। স্বামীর মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারছেন না তিনি। বিলাপ করতে করতে ভূমিকা বলছিলেন, কাজে যাওয়ার আগে পলাশ তাঁকে বলেছিলেন, ‘আমি কাজে যাচ্ছি। চলাফেরা করতে সাবধান থেকো।’ অথচ তিনিই আর ফিরলেন না।

গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর ভূমিকার সঙ্গে বিয়ে হয় ২৭ বছর বয়সী পলাশের। নিজেদের বাড়ি নেই। মামাদের থাকতে দেওয়া সেমি পাকা ঘরেই স্ত্রীকে নিয়ে সংসার পেতেছিলেন তিনি। একসময় ছোট ভাইকে নিয়ে সাগরে মাছ ধরতেন। কয়েক বছর ধরে কাঙ্ক্ষিত মাছ মিলছিল না। সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। ফলে এ বছর আর মাছ ধরেননি পলাশ। জাহাজভাঙা কারখানায় শ্রমিকের কাজ নেন তিনি।

গতকাল বেলা দুইটার দিকে কারখানার ফটকের পাশে রাখা ছিল পলাশের লাশ। মাথার কাছে বসে ছিলেন মা শোভারানী জলদাস। কাছেই ছিলেন হতবাক বাবা হরেন্দ্র জলদাস। বিলাপ করতে করতে শোভারানী বলছিলেন, ‘বাবা রে, তুই কেমনে চলে গেলি। আমি এখন কী নিয়ে থাকব, বাবা? প্রথম সন্তান হবে। তুই কত আনন্দ করছিলি। সন্তানটাও দেখে যেতে পারলি না।’

অনাগত সন্তানকে ঘিরে পলাশ প্রায়ই কথা বলতেন বন্ধু লিটন জলদাসের সঙ্গে। লিটন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সন্তান হলে কী নাম রাখবেন, কী পোশাক পরাবেন, কীভাবে বড় করে তুলবেন—এসব নিয়ে ভাবতেন পলাশ। অনটনের সংসারে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে না পারায়ও আফসোস করতেন তিনি। সামনের মাসে চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার ইচ্ছা ছিল পলাশের।

এই জাহাজ কারখানার দুর্ঘটনায় একই এলাকায় আরেক পরিবারেও শোক নেমেছে। পলাশের বাড়ি থেকে ১০০ মিটার পূর্বে আরেকটি বাড়ি। গতকালের দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ওই বাড়ির দুই ভাই—মোহাম্মদ মনসুর ও মো. নাসির উদ্দিন। মনসুরের বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছোট মেয়ে একাদশ শ্রেণিতে পড়ে। নাসিরের একমাত্র মেয়ে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী। দুর্ঘটনায় এ এলাকার সানি জলদাস নামে আরেকজনও নিহত হয়েছেন। ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকায় তাঁর বসবাস।

মনসুর ও নাসির—দুই ছেলেকে একসঙ্গে হারিয়ে কাঁদছিলেন ৭০ বছর বয়সী বাবা সেকান্দর মিয়া। তিনি বলছিলেন, ‘আমার বড় ছেলে মনসুর দাবাই (ওষুধ) আনবার কথা বলে ঘর থেকে বেরিয়েছিল সকালে। আর ফিরল না ছেলেটি। এখন আমার দাবাই আনবে কে? কে আমাদের দেখবে? বৃদ্ধ বয়সে যাব কার কাছে?’