ঝালকাঠি জেলার ৬০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চরম ঝুঁকির মধ্যে পাঠদান চলছে। ভবনের ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়া, রড বেরিয়ে আসা, দেয়ালে বড় বড় ফাটল এবং ভবন কেঁপে ওঠার মতো আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির মধ্যেই প্রতিদিন শ্রেণিকক্ষে বসতে হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। দীর্ঘদিন ধরে নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানানো হলেও কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, ঝালকাঠি জেলায় মোট ৫৮৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে, যার মধ্যে ৬০টি বিদ্যালয়কে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলার ১৬২টি বিদ্যালয়ের ২৪টি, নলছিটির ১৬৭টির মধ্যে ২১টি, রাজাপুরের ১২৪টির মধ্যে ১৩টি এবং কাঁঠালিয়ার ১৩২টির মধ্যে ২টি বিদ্যালয় ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থী মুমিত, অনিক ও জিহাদ জানায়, "প্রতিদিন ভয় নিয়েই তাদের ক্লাস করতে হয়। প্রায়ই ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে। অনেক সময় মাথা ও শরীরেও লাগে। তারা সব সময় আতঙ্কে থাকে—কখন না আবার পুরো ভবন ভেঙে পড়ে।"

একই কথা echoed করে শিক্ষার্থী ইলমা ও ইশরাতসহ আরও অনেকে বলেন, "ক্লাস করার সময় ভয় লাগে। ছাদের পলেস্তারা পড়ে, দেয়ালে ফাটল। মনে হয়, যে কোনো সময় ভবন ভেঙে যেতে পারে। তারপরও পড়াশোনা করতে আসতে হয়।"

অভিভাবক কালাম, আজিজ ও মোকলেছুর রহমানসহ অনেকের অভিযোগ, ভবনের বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়ায় ইতিমধ্যে কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। ফলে অনেক শিশু স্কুলে যেতে ভয় পায়। তবে আশপাশে বিকল্প বিদ্যালয় না থাকায় বাধ্য হয়ে সন্তানদের এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেই পাঠাতে হচ্ছে। অভিভাবক আবুবকর বলেন, "সন্তানকে প্রতিদিন ভয় নিয়ে স্কুলে পাঠাই। কখন কী দুর্ঘটনা ঘটে, সেই দুশ্চিন্তায় থাকি। নতুন ভবন নির্মাণে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।"

ঝালকাঠি সদর উপজেলার ১৬১ নম্বর আগলপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সবুজ কুমার রুদ্র জানান, ২০০২ সালে নির্মিত এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৫৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তিনি বলেন, "বর্তমানে বিভিন্ন স্থানের পলেস্তারা খসে পড়ছে। মাঝেমধ্যে শিক্ষার্থীদের গায়েও পড়ে। নতুন ভবনের জন্য উপজেলা শিক্ষা অফিসে আবেদন করেছি, কিন্তু এখনও কোনো বরাদ্দ পাইনি।"

নলছিটি উপজেলার ৮৫ নম্বর কাঁঠাখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. বাবুল হোসেন সিকদার বলেন, "বিদ্যালয়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। শিক্ষার্থীরা একটু দৌড়াদৌড়ি করলেই ভবন কেঁপে ওঠে। এমনকি পাশের সড়ক দিয়ে ভারী যানবাহন চললেও পুরো ভবন দুলতে থাকে। বর্তমানে ১৬২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। উপজেলা ও জেলা শিক্ষা অফিসে একাধিকবার আবেদন করেছি। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা হয়নি। বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছি।"

রাজাপুর উপজেলার ৮৫ নম্বর উত্তর কাঠিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সমীর কুমার দাস জানান, ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ের চার কক্ষবিশিষ্ট ভবনটি ১৯৯৩ সালে নির্মিত হয়। প্রায় এক দশক আগে থেকেই পলেস্তারা খসে রড বেরিয়ে গেছে এবং দেয়ালে বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। বর্তমানে ৫২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তিনি বলেন, "কক্ষ সংকট নিরসনে ২০২৪ সালে এলজিইডির অর্থায়নে তিন কক্ষের একটি কাঠ-টিনের ঘর নির্মাণ করা হলেও কাঁচা মেঝের কারণে সেখানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই ক্লাস নিতে হচ্ছে।"

কাঁঠালিয়া উপজেলার ৯০ নম্বর উত্তর ছিটকি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক খাদিজা আক্তার জানান, ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ভবনটি ২০২৪ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমানে ৩৯ জন শিক্ষার্থীর পাঠদান টিনশেড ঘরে চলছে। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে গেছে বলে তিনি জানান।

এই বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহিনুল ইসলাম মজুমদার বলেন, "জেলার সব ঝুঁকিপূর্ণ বিদ্যালয়ের তালিকা প্রস্তুত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন ও বরাদ্দ পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে নতুন ভবন নির্মাণ করা হবে।"

শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকরা দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।