চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের একটি জাহাজভাঙা কারখানায় স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় ‘বিষাক্ত গ্যাসে’ মৃত্যু হয়েছে আট শ্রমিকের। ওই শ্রমিকেরা অসুস্থ হয়ে পড়ার পর তাঁদের সময়মতো চিকিৎসা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ সহকর্মীদের। জাহাজটি কাটার আগে যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে গ্যাসমুক্ত করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

আজ শুক্রবার সকাল নয়টার দিকে ভাটিয়ারী ইউনিয়নের স্টেশন রোড এলাকার ফেরদৌস স্টিল নামের একটি কারখানায় এ ঘটনা ঘটে। যে জাহাজটি কাটা হচ্ছিল সেটি এলএনজি পরিবহন করত।

মারা যাওয়া আট শ্রমিকের মধ্যে পাঁচজনের নাম-পরিচয় জানা গেছে। তাঁরা হলেন, সানি জলদাস, পলাশ জলদাস, হাবিবুর রহমান, মনসুর আলী ও নাসির উদ্দিন। তাঁরা ভাটিয়ারী এলাকার বাসিন্দা। এর মধ্যে মনসুর আলী ও নাসির উদ্দিন ভাই।

.

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী শ্রমিক শুভ জলদাস মুক্তকণ্ঠকে বলেন, জাহাজটির এলএনজি ট্যাংক কাটার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে ছিল। জাহাজের তলায় থাকা একটি ট্যাংক কাটার কাজ চলছিল। শুক্রবার সকালেও শ্রমিকেরা সেখানে কাজ করছিলেন।

শুভ বলেন, সকাল সাড়ে আটটার দিকে ফোরম্যান সাত-আটজন শ্রমিক ও কাটারম্যান নিয়ে একটি ট্যাংকের চারপাশ গোল করে কাটেন। এরপর সেখান থেকে সরে যান। প্রায় ১০ মিনিট পর গর্তটি পুরোপুরি খোলার জন্য সেখানে গেলে প্রথমে দুজন শ্রমিক জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। তাঁদের উদ্ধার করতে গিয়ে আরও দুজন শ্রমিক গ্যাসে আক্রান্ত হন। এরপর কাটিং ফোরম্যান তাঁদের উদ্ধারে এগিয়ে গিয়ে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যান। কী ঘটেছে, তা দেখতে একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তা মুখে মাস্ক পরে সেখানে যান। তিনিও জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।

একের পর এক শ্রমিককে আক্রান্ত হতে দেখে তিনিও এগিয়ে গিয়েছিলেন বলে জানান শুভ। তিনি বলেন, দূর থেকে একটি হুক লাগিয়ে একজনকে টেনে তোলার চেষ্টা করেন তিনি। এ সময় তিনিও গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে জাহাজের বাইরে কাদামাটিতে বেহুঁশ হয়ে যান। কিছুক্ষণ অচেতন থাকার পর ক্রেন অপারেটর তাঁকে টেনে তোলেন।

.

কারখানাটির শ্রমিক মো. রফিক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, অচেতন হয়ে পড়া শ্রমিকদের সবাই ঘটনাস্থলে মারা যাননি। তাঁদের কয়েকজনকে জাহাজ থেকে উদ্ধার করে নিরাপদ দূরত্বে নেওয়ার পরও সময়মতো হাসপাতালে পাঠানো হয়নি।

রফিক বলেন, ‘পলাশ জলদাসকে উদ্ধারের পরও তিনি জীবিত ছিলেন। কিন্তু তখন কারখানার ভেতরে কোনো অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসক বা অক্সিজেন সিলিন্ডার ছিল না। সময়মতো অক্সিজেন দেওয়া গেলে এত প্রাণহানি হতো না।’

দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, কারখানার ভেতরে তিনটি অ্যাম্বুলেন্স রাখা। এর মধ্যে দুটি কিছুক্ষণ পর বের হয়ে যায়। কারখানার ফটকের পাশে তখনো পলাশ জলদাস ও সানি জলদাশের লাশ পড়ে রয়েছে। স্বজনেরা লাশ দুটি ঘিরে কান্নাকাটি করছেন। এক শ্রমিককে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে নিয়ে যেতে দেখা যায় ফায়ার সার্ভিসকে।

.

ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে কুমিরা ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। এরপর হতাহত ব্যক্তিদের উদ্ধার করে।

তৌফিকুল ইসলাম বলেন, ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড ও রিসাইক্লিং কারখানায় যে জাহাজটি কাটা হচ্ছে সেটি এলএনজি পরিবহন করত। এ ধরনের জাহাজগুলো আগে গ্যাসমুক্ত করে তারপর কাটতে হয়। কিছু কিছু ট্যাংকে ফ্লোরিন, কার্বন মনোক্সাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড থাকতে পারে। এগুলো খুবই বিষাক্ত। কারখানা কর্তৃপক্ষ ট্যাংক গ্যাসমুক্ত না করে কাটার কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারখানার নিরাপত্তাব্যবস্থাও ছিল খুবই দুর্বল।

.

পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী পরিচালক আশরাফ উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, খবর পেয়ে তাঁদের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে দুর্ঘটনার কারণ জানার চেষ্টা করছেন। এ ঘটনায় তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের পরিদর্শক এস এম সাখাওয়াত হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তিনি ঘটনাস্থলে রয়েছেন। কীভাবে ঘটনাটি ঘটল এবং কেন ঘটল তা জানার চেষ্টা করছেন তিনি। এস এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘তদন্ত শেষে বিস্তারিত জানা যাবে। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে কার্বন ডাই-অক্সাইড, হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসসহ অন্যান্য গ্যাস মিলে একটা টক্সিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। যাতে আক্রান্ত হয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।’

.সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা কারখানায় বিষক্রিয়ায় মৃত্যু বেড়ে ৮.

জাহাজ কাটার আগে গ্যাসমুক্ত করা হয়েছে কি না সেটি দেখভাল করেন বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জাহাজটি এলএনজি পরিবাহী। মূলত কার্গো গ্যাস ট্যাংক গ্যাসমুক্ত কি না, তাঁরা বিষয়টি দেখেছেন। এ ছাড়া ইঞ্জিনকক্ষে তেল রয়েছে এমন ট্যাংকগুলো গ্যাসমুক্ত আছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব রয়েছে তাঁদের। তবে এর বাইরে ছোট ছোট কিছু চেম্বার ট্যাংক থাকে, যেগুলোতে হাইড্রোজেন সালফাইড, অ্যামোনিয়া, কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ইত্যাদি গ্যাস রাখা হয়। সেগুলো থেকে ঘটনাটি ঘটেছে কি না, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছে। তবে কোন গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, তা নিশ্চিত করে বলা এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। ঘটনাটি তদন্তে এবং কোন গ্যাসে শ্রমিকেরা আক্রান্ত হয়েছেন, তা জানার জন্য সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞ টিম এবং বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের খবর দেওয়া হয়েছে। তাঁরা ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি তদন্ত করার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।

.

কারখানার মালিকপক্ষের প্রতিনিধি মো. মহিউদ্দিন বেলা দুইটার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, কারখানার সেফটি বিভাগের লোকজন কাজ করার সময় দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।

মো. মহিউদ্দিন বলেন, শুক্রবার কারখানা বন্ধ থাকে। সেফটি বিভাগের লোকজন কারখানার নিরাপত্তার বিষয়টি দেখাশোনা করছিলেন। এ সময় দুর্ঘটনাটি ঘটে। কারখানায় ক্ষতিগ্রস্ত সব শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারকে বাংলাদেশের আইন অনুসারে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।