কুমিল্লা-১০ (নাঙ্গলকোট ও লালমাই উপজেলা) আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও দলের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন তিনি। কিন্তু দল মনোনয়ন দেয় একই আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল গফুর ভূঁইয়াকে। তিনি মনোনয়নপত্র দাখিল করেন, যাচাই-বাছাইয়ে প্রার্থিতা টিকে যায়। মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়াও মনোনয়নপত্র জমা দেন বিএনপির প্রার্থী হিসেবে। দলীয় প্রত্যয়নপত্র না থাকায় সেটি যাচাই-বাছাইয়ে বাতিল হয়ে যায়। তবে মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়াই এখন এই আসনে ধানের শীষের প্রার্থী।

গতকাল রোববার কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার দাখিল করা মনোনয়নপত্র বাতিলে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে তাঁর মনোনয়নপত্র গ্রহণ করতে ইসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রার্থিতা ফিরে পেতে মনোনয়নপত্র বাতিলে ইসির সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে মোবাশ্বেরের করা এক রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে বিচারপতি রাজিক-আল-জলিল ও বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেন।

আজ সোমবার দুপুরে এ প্রসঙ্গে কুমিল্লা জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা মু. রেজা হাসান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত স্থগিত করে হাইকোর্ট মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়াকে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দিতে নির্দেশ দিয়েছেন—এমন একটি নির্দেশের বিষয় আমরা জেনেছি এবং সেটি অনলাইনে যাচাই করে সত্যতা পাওয়া গেছে। উচ্চ আদালতের এই আদেশের সার্টিফায়েড কপি মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার আবেদনসহ আজকেই জমা দেওয়ার কথা। আশা করছি, সেটি পেলে আজ বিকেলের মধ্যেই তাঁকে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে।’

পরে সোমবার সন্ধ্যায় ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ পেয়েছেন মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া। রিটানিং কর্মকর্তা মু. রেজা হাসানের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে গিয়ে মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার প্রস্তাবকারী, সমর্থনকারীসহ নেতা-কর্মীরা তাঁর পক্ষে প্রতীক সংগ্রহ করেন।

রিটানিং কর্মকর্তা মু. রেজা হাসান কুমিল্লা-১০ আসনের বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়াকে প্রতীক বরাদ্দের বিষয়টি নিশ্চিত। তিনি বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়াকে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার পক্ষে দলীয় প্রতীক সংগ্রহের পর তাঁর অনুসারী নাঙ্গলকোট উপজেলা বিএনপি নেতা নুরুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘কথায় আছে শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। আমাদের নেতা মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার ক্ষেত্রে এমন ঘটনাই ঘটেছে। আশা করছি তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হবেন ভোটের মাঠে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ৩ নভেম্বর আবদুল গফুর ভূঁইয়াকে দলীয় মনোনয়ন দিলে মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার অনুসারীরা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে চূড়ান্ত মনোনয়নের আগপর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। তবে আবদুল গফুর ভূঁইয়াকেই দল চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়। ৩ জানুয়ারি যাচাই-বাছাইয়ে তাঁর প্রার্থিতা বৈধতা পায়। পরে আবদুল গফুর ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে হলফনামায় তাঁর দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি গোপনের অভিযোগে ইসিতে আপিল করেন একই আসনে বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের প্রার্থী কাজি নুরে আলম ছিদ্দিকি। ১৮ জানুয়ারি এ নিয়ে শুনানির পর গফুর ভূঁইয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করে ইসি। এরপর প্রার্থিতা ফিরে পেতে উচ্চ আদালতে রিট করেন গফুর। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে মো. আবদুল গফুর ভূঁইয়ার করা রিটটি ২২ জানুয়ারি সরাসরি খারিজ করে দেন হাইকোর্ট। হাইকোর্ট গফুর ভূঁইয়ার করা রিট খারিজ করে দেওয়ায় মনোনয়নপত্র বাতিলে ইসির সিদ্ধান্তই বহাল থাকে।

এদিকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও ঋণখেলাপি ও দলীয় প্রত্যয়নপত্র জমা না দেওয়ায় ৩ জানুয়ারি বাছাইয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করেন। এর বিরুদ্ধে তিনি নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করেন। শুনানি নিয়ে নির্বাচন কমিশন ১৮ জানুয়ারি মোবাশ্বেরের আপিল নামঞ্জুর করে রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। এই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে প্রার্থিতা ফিরে পেতে ১৯ জানুয়ারি তিনি হাইকোর্টে রিট করেন। গফুর ভূঁইয়ার মনোনয়নপত্র বাতিলের দিনই মোবাশ্বের আলমকে বিএনপির মহাসচিব স্বাক্ষরিত দলীয় প্রত্যয়নপত্রে কুমিল্লা-১০ আসনের দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়।

মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ঋণখেলাপি ও দলীয় প্রত্যয়ন নেই—এ দুই গ্রাউন্ডে তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছিল। মোবাশ্বের আলম গত ১০ ডিসেম্বর এককালীন অর্থ পরিশোধ করেন, যার পরিপ্রেক্ষিতে ২৯ ডিসেম্বরের আগেই ঋণ পুনঃ তফসিল হয়। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক যোগাযোগ করতে গিয়ে দেরি করেছে। পুনঃ তফসিলের পরবর্তী সময়ে সব টাকা পেয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক জানিয়েছে। তাই তিনি খেলাপি নন। আর দলীয় প্রত্যয়নপত্র ছাড়া তিনি মনোনয়নপত্র জমা দেন।

জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আরও বলেন, ‘একই আসনে গফুর ভূঁইয়ার দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি তাঁর হলফনামায় গোপন করার অভিযোগে অন্য এক প্রার্থীর করা আপিলের কারণে তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। ওই দিনই বিএনপি মোবাশ্বের আলমকে চূড়ান্ত করে দলীয় চিঠি তাঁর হাতে দেয়। পরে তিনি দলীয় চিঠি নিয়ে নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে হাজির হন মনোনয়নপত্রের বৈধতার জন্য। তবে হাতে হাতে চিঠি নেওয়া হবে না বলে জানানো হয়। পরে তিনি রিট করেন। সর্বশেষ মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত স্থগিত করে হাইকোর্ট তাঁকে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। আজ সোমবারই তিনি প্রতীক পাবেন বলে আমরা আশা করছি।’

২১ জানুয়ারি কুমিল্লা-১০ আসনে ছয়জনকে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জামায়াতের প্রার্থী মুহাম্মদ ইয়াছিন আরাফাতকে দাঁড়িপাল্লা, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো. শামছুদ্দোহাকে হাতপাখা, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের প্রার্থী কাজি নুরে আলম ছিদ্দিকিকে ছড়ি, বাংলাদেশ কংগ্রেসের হাছান আহম্মেদকে ডাব, গণ অধিকার পরিষদের রমিজ বিন আরিফকে ট্রাক এবং আমজনতার দলের মো. আবদুল্লাহ আল নোমানকে প্রজাপতি প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়।

সর্বশেষ রোববার (২৫ জানুয়ারি) রাতে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার সুয়াগাজিসংলগ্ন ফুলতলী এলাকার ডিগবাজি মাঠে নির্বাচনী সমাবেশ করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ওই সমাবেশে কুমিল্লা ও চাঁদপুরের বিএনপির ১৪ জন প্রার্থী উপস্থিত ছিলেন। সমাবেশে মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া কুমিল্লা-১০ আসনে বিএনপির নতুন প্রার্থী হিসেবে বক্তব্য দেন।

আজ দুপুরে মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়া মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আল্লাহর অশেষ রহমতে শেষ পর্যন্ত দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। আমি যখন দলের প্রত্যয়নপত্র ছাড়া মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলাম, তখন অনেকে আমাকে পাগল বলেছিল, অনেকে আমাকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে বলেছিল। কিন্তু আমি বলেছি, কখনো দলের বাইরে যাব না। আমার সেদিনের ওই সিদ্ধান্ত ছিল একমাত্র আল্লাহর রহমত। এর বাইরে কিছুই নয়। কুমিল্লা-১০ আসন মূলত ধানের শীষের ঘাঁটি। ইনশা আল্লাহ বিপুল ভোটে বিজয়ী হব বলে আশা করছি।’