পোশাক খাতের পাশাপাশি এখন তীব্র গ্যাস সংকটের কবলে পড়েছে নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানাগুলো। দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বেশ কিছু বড় শিল্পগোষ্ঠীর প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু প্রতিষ্ঠান বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে উৎপাদন সচল রাখলেও সামগ্রিক সক্ষমতা অনেক কমে গেছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ কর্পোরেশন (পেট্রোবাংলা) ও জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট, যেখানে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হয় প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) থেকে আসে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট। তবে গত বুধবার (১২ আগস্ট) থেকে এই সরবরাহ কমে ২০৩ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। ফলে দৈনিক প্রায় ৩৮৫ কোটি ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৭ কোটি ঘনফুটে।
এই সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্পাঞ্চলগুলোতে। নিত্যপণ্যের পাশাপাশি গ্যাস ও বয়লারনির্ভর ইস্পাত, কাচ এবং বস্ত্র শিল্পেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকার সময়ে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতে এই সংকট আরও তীব্র হয়ে উঠেছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে (গত অর্থবছর) চিনি, গম, ভোজ্যতেল ও ডালসহ সাতটি প্রধান নিত্যপণ্য ও কাঁচামাল আমদানি হয়েছে প্রায় ১ কোটি ৫৪ লাখ টন। এর বড় অংশ অপরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করা হয় এবং দেশে কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করা হয়। ব্যবসায়ীদের মতে, কাঁচামাল হাতে থাকলেও গ্যাসের অভাবে প্রস্তুত পণ্যের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সংকটের মুখে গত বুধবার থেকে নারায়ণগঞ্জে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) ১২টি নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা বন্ধ রয়েছে। এনবিআরের তথ্যমতে, গত অর্থবছরে প্রধান সাতটি পণ্য ও কাঁচামাল আমদানির ২২ শতাংশই ছিল এই গ্রুপের। এমজিআই-এর হিসাবে, তাদের কারখানায় দিনে প্রায় ৯ হাজার টন এবং বছরে প্রায় ৩৩ লাখ টন পণ্য প্রক্রিয়াজাত হয়।
এমজিআইয়ের চেয়ারম্যান মোস্তফা কামাল বলেন, "গ্যাসের সংকটে বুধবার থেকে একে একে নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতসহ গ্যাসনির্ভর সব কারখানার উৎপাদন বন্ধ করতে হয়েছে। নিত্যপণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য এসব কারখানার উৎপাদন সচল রাখতে জরুরি ভিত্তিতে হলেও গ্যাস সরবরাহ করা দরকার।"
অন্যদিকে, টি কে গ্রুপের ২৮টি প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানার মধ্যে ২০টি বন্ধ রয়েছে। গত অর্থবছরে আলোচ্য সাত পণ্য ও কাঁচামাল আমদানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা এই গ্রুপটি প্রায় ১০ লাখ টন পণ্য আমদানি করেছে। টি কে গ্রুপের পরিচালক মুহাম্মদ মোস্তফা হায়দার জানান, তাদের ২৮টি কারখানার মধ্যে চারটি কারখানায় সীমিতভাবে উৎপাদন চলছে, বাকিগুলো বন্ধ। এর বেশিরভাগই নিত্যপণ্যের কারখানা।
স্মাইল ফুড প্রোডাক্টসের চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের চিনি, সয়াবিন বীজ মাড়াই এবং পাম ও সয়াবিন তেল প্রক্রিয়াজাতকরণের তিনটি বড় কারখানা বন্ধ রয়েছে। চট্টগ্রামে কেবল আটা-ময়দার একটি ছোট কারখানায় উৎপাদন চলছে। গ্রুপটির একজন কর্মকর্তা জানান, গ্যাসের অভাবে মঙ্গলবার থেকেই বড় তিনটি কারখানার উৎপাদন বন্ধ।
সীকম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ডেল্টা এগ্রোফুডের সয়াবিন বীজ মাড়াই ও ভোজ্যতেল প্রক্রিয়াজাতকরণের তিনটি কারখানাও মঙ্গলবার থেকে বন্ধ। সীকম গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমিরুল হক বলেন, "কারখানায় কাঁচামাল আছে। কিন্তু গ্যাসের অভাবে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব নয়।"
সিটি গ্রুপের হোসেন্দী অর্থনৈতিক অঞ্চলের কারখানাগুলো এবং অন্যান্য নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকারী কারখানার উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটির একজন কর্মকর্তা।
কিছু প্রতিষ্ঠান বিকল্প উপায়ে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। নাবিল গ্রুপের প্রায় ২০টি কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানান, গ্যাস না পাওয়ায় বিদ্যুৎ ব্যবহার করে উৎপাদন চালানো হচ্ছে, তবে এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে এবং সক্ষমতা ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের বেশি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
শিল্পগোষ্ঠীগুলোর দায়িত্বশীলদের মতে, বর্তমানে গুদামে মজুত থাকা পণ্য বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে বলে তাৎক্ষণিক সংকট তৈরি হয়নি। তবে উৎপাদন বন্ধ থাকায় মজুত দ্রুত কমছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিস্থিতি জটিল করতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, "নিত্যপণ্যের সরবরাহ ঠিক রাখতে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। সরবরাহ ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে বাজারে যাতে বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়, সেজন্য ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনার পাশাপাশি বাজারে নজরদারি দরকার। সংকট কাটাতে সরকার কী কী উদ্যোগ নিচ্ছে, কত দিন লাগবে–এসব তথ্য প্রকাশ করা দরকার।"