ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই ছাত্ররাজনীতিতে জড়ানোর মাধ্যমে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক পথচলার শুরু। উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক কারণে জেলও খেটেছেন তিনি। স্বাধীনতার পর শিক্ষকতা পেশা দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন; পরে শিক্ষকতা ছেড়ে রাজনীতিতে যুক্ত হন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি জেলা বিএনপির সভাপতি, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ধারাবাহিকতায় পৌরসভার চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রীও হয়েছেন। এখন তিনি দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি পদে যাচ্ছেন বলে আলোচনায়।
রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। সংসদে দলটির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তিনিই রাষ্ট্রপতি হতে যাচ্ছেন—এটি প্রায় নিশ্চিত। ইতিমধ্যে তিনি দলের মহাসচিব এবং জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২০ আগস্ট নির্বাচিত হয়ে রাষ্ট্রপতির বাসভবন বঙ্গভবনে যাবেন তিনি।
মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মনতোষ কুমার দে বলেন, ‘আমার বন্ধু রাষ্ট্রপতির পদ অলংকৃত করবে, এটা শুধু আমার জন্য নয়; দেশবাসীর জন্যও গর্বের। তবে আমরা ঠাকুরগাঁওবাসী তাঁর নৈকট্য থেকে বঞ্চিত হব—এটা ভাবতে মন খারাপ লাগছে। তাঁর হাত ধরে এলাকায় যে উন্নয়নের কর্মধারা সৃষ্টি হয়েছে, তার গতি যদি শ্লথ হয়ে যায়, তা হবে আমাদের জন্য আশঙ্কাজনক।’
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি মির্জা ফখরুলের জন্ম ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায়। তাঁর পিতা মির্জা রুহুল আমিন ও মাতা মির্জা ফাতেমা আমিন। মির্জা রুহুল আমিন ঠাকুরগাঁওয়ে একাধিকবারের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং পরে এরশাদ সরকারের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন মির্জা ফখরুল।
ছাত্রজীবনেই তাঁর রাজনীতিতে হাতেখড়ি হয়। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য ছিলেন তিনি এবং সংগঠনটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এস এম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় রাজনৈতিক কারণে তাঁকে কারাগারেও যেতে হয়।
দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডার হিসেবে ঢাকা কলেজের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মির্জা ফখরুল। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮২ সালে এস এ বারীর পদত্যাগের পর তিনি আবার শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যান। ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে কর্মরত অবস্থায় তিনি সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক এবং ইউনেসকো জাতীয় কমিশনে কাজ করেছেন।
১৯৮৮ সালে নির্দলীয় প্রার্থী হিসেবে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের পর তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি দলীয় প্রার্থী হন। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব নেন এবং পাশাপাশি কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর বিএনপি সরকারের কৃষি প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। তৎকালীন আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের আমলে তিনি বিরোধীদলীয় মুখপাত্র হিসেবে গণমাধ্যমে পরিচিতি লাভ করেন। ২০১১ সালের মার্চে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ বিএনপির ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে তিনি মহাসচিব হন।
২০২৬ সালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান মির্জা ফখরুল। এরপর আজ তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। ইতিমধ্যে তিনি দলের মহাসচিব ও জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। রাজনীতি ছাড়াও তিনি ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমেও সম্পৃক্ত ছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবনে মির্জা ফখরুল বিবাহিত। তাঁর স্ত্রী রাহাত আরা বেগম ঢাকার একটি বিমা কোম্পানিতে কর্মরত। দুই মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর সেখানে শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী ও পোস্ট ডক্টরাল ফেলো। ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পর ঢাকার একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।
মির্জা ফখরুলের ছোট ভাই মির্জা ফয়সাল আমিন ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি। চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ বিএনপি সরকারের সাবেক ভূমিমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন। আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা ১৯৭১ সালের মুজিবনগর প্রবাসী সরকারে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তখন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ সুবিধা তদারকির জন্য গঠিত যুব শিবির অধিদপ্তরের প্রধান হিসেবে তাঁকে মনোনীত করা হয়েছিল।
ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর মনোনয়নের খবরে তাঁরা খুবই আনন্দিত। তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞা দিয়ে দেশের জন্য কাজ করবেন—এটাই তাঁদের প্রত্যাশা।