সারি সারি সবুজ গাছের মধ্যে লালচে-গোলাপি পাকা ড্রাগন ঝুলতে দেখা যায়। কোথাও শ্রমিকেরা ফল তুলছেন, আবার অন্য জায়গায় বাছাই ও প্যাকেটজাতের কাজ চলতে থাকে। জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার বাগজানা ইউনিয়নের বাগজানা গ্রামের এই ড্রাগনবাগান পরিচর্যা করা হয়েছে এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হিসেবে। ৫০ বিঘার পরিসরে ঢুকলেই সবুজের ভেতর অসংখ্য লালচে রঙের উপস্থিতি চোখে পড়ে—যেগুলো আসলে ফুল নয়, পাকা ড্রাগন।

এই বাগানের উদ্যোক্তা তরুণ হেদায়েত হোসেন শিপলু। একসময় পড়ে থাকা জমিতে তিনি ২০২৪ সালে ড্রাগন চাষ শুরু করেন। বর্তমানে সেখানে লক্ষাধিক ড্রাগনগাছ আছে। এ বছর প্রথমবারের মতো পুরোদমে ফলন এসেছে। বাগানে প্রায় ৬০ জন শ্রমিক কাজ করছেন, যাঁদের বেশির ভাগই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নারী-পুরুষ।

৫০ বিঘা জমির মধ্যে হেদায়েতের নিজের জমি ৭ বিঘা। বাকি জমি ১৫ বছরের জন্য ইজারা নিয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, একসময় এসব জমি পতিত ছিল। এখন সেখানে লক্ষাধিক ড্রাগনগাছ রয়েছে।

গত মঙ্গলবার বাগানে গিয়ে দেখা যায়, সারিবদ্ধ প্রায় প্রতিটি গাছেই পাকা ড্রাগন। শ্রমিকেরা গাছ থেকে ড্রাগন সংগ্রহ করে আকার ও মান অনুযায়ী আলাদা করছেন। বাগানের এক পাশে চলে প্যাকেটজাতের কাজ। এরপর ট্রাকে করে ফলগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে।

দক্ষিণ দামোদরপুর গ্রামের বাসিন্দা রত্না বেগম বাগান দেখে বলেন, “এত বড় ড্রাগনবাগান আগে দেখিনি। গাছে গাছে ড্রাগন দেখে খুব ভালো লাগছে। এমন বাগান এলাকায় আরও হওয়া উচিত।”

বাগানের জমি বণ্টন সম্পর্কেও একই তথ্য দিয়েছেন উদ্যোক্তা হেদায়েত। তিনি বলেন, ৫০ বিঘার মধ্যে নিজের জমি ৭ বিঘা এবং বাকি জমি তিনি ১৫ বছরের জন্য ইজারা নিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, একসময় এসব জমি পতিত ছিল, এখন সেখানে লক্ষাধিক ড্রাগনগাছ রয়েছে। তাঁর বাগানে থাই, বারী-১, ভিয়েতনাম, হলুদ ও পলেরা—এই পাঁচ জাতের ড্রাগনের চাষ হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি কেজি ড্রাগন ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

বেসরকারি চাকরির নিশ্চয়তা ছেড়ে কৃষিকে জীবনের পথ হিসেবে বেছে নেওয়ার কথা জানিয়ে হেদায়েত বলেন, ‘চাকরি করলে হয়তো শুধু নিজের পরিবার চলত। কিন্তু কৃষিকে বেছে নেওয়ায় অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এই বাগান শুধু ব্যবসা নয়, এলাকার মানুষের জীবিকারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।’

বাগানে কাজ করা শ্রমিক জুয়েল হোসেন বলেন, “এখানে সারা বছরই কাজ পাওয়া যায়। নিয়মিত আয় হওয়ায় সংসার চালাতে সুবিধা হচ্ছে।”

ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর শ্রমিক পারভীন টপ্প জানান, “আগে কাজের জন্য বিভিন্ন জায়গায় যেতে হতো। এখন এই বাগানেই নিয়মিত কাজ পাই। এতে পরিবারের খরচ চালানো সহজ হয়েছে।”

বর্তমানে জেলায় প্রায় ২০ হেক্টর জমিতে এ ড্রাগন চাষ হচ্ছে। হেদায়েতের বাগানটি জেলার অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক ড্রাগনবাগান। কৃষি বিভাগ নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে আসছে।

এ কে এম সাদিকুর ইসলাম, উপপরিচালক, জয়পুরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর

তবে আধুনিক ফল চাষে কৃষি বিভাগের কাছ থেকে প্রত্যাশিত কারিগরি সহযোগিতা সব সময় পাননি বলে অভিযোগ করেন হেদায়েত। সরকারি সহায়তা আরও বাড়ানো হলে এ অঞ্চলে ড্রাগন চাষের পরিধি দ্রুত বাড়বে বলে তাঁর বিশ্বাস।

জয়পুরহাট জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম সাদিকুর ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ড্রাগন একটি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ও উচ্চমূল্যের ফল। বর্তমানে জেলায় প্রায় ২০ হেক্টর জমিতে এ ড্রাগন চাষ হচ্ছে। হেদায়েতের বাগানটি জেলার অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক ড্রাগনবাগান। কৃষি বিভাগ নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে আসছে। এ ধরনের উদ্যোগ জেলার কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষি উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।