অভিনেতা হওয়ার স্বপ্নই ছিল গুরমিত চৌধুরীর ঠিকানা। দ্বাদশ শ্রেণির পরীক্ষা শেষ করেই তিনি মুম্বাইয়ে পাড়ি জমান। স্বপ্ন ছিল অভিনয়ের, কিন্তু বড় কোনো পরিচয় বা অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা ছিল না। নতুন শহরে টিকে থাকার লড়াইয়ে একসময় তাঁর প্রতিদিনের খরচ নেমে এসেছিল মাত্র ৩৬ রুপিতে (প্রায় ৪৫ টাকা)। দুপুরের খাবার বলতে অনেক দিনই ছিল বিস্কুট। এক প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে আরেকটিতে যেতে একাধিক বাস বদলাতে হতো। হাতে থাকত অভিনয়ের পোর্টফোলিও, চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন।

আজ সেই গুরমিতের জীবন অনেকটাই বদলে গেছে। অভিনয়ের জগতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার পাশাপাশি তিনি গড়ে তুলেছেন কোটি রুপির সম্পদ। মুম্বাইয়ে তাঁর প্রায় ১৬ কোটি রুপির বাড়ি (প্রায় ২১ কোটি টাকা)। একই সঙ্গে স্বপ্নের খামারবাড়ি বানানোর পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর।

মুম্বাইয়ে গুরমিতের শুরুটা মোটেই সহজ ছিল না। পরীক্ষা শেষ করেই তিনি সেখানে যান। লক্ষ্য ছিল একটাই—অভিনেতা হওয়া। কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবতার ফারাকটা মুম্বাই পৌঁছানোর পরই টের পান। প্রথমে তিনি মডেল হিসেবে কাজ শুরু করেন। টেলিভিশনেও ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান। অনেক সময়েই তাঁর নাম পর্যন্ত উল্লেখ করা হতো না। কাজ ছিল অনিয়মিত, আয়ও ছিল সামান্য। ফলে ব্যয়বহুল মুম্বাইয়ের মতো শহরে টিকে থাকাই হয়ে ওঠে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানের দরজায় দরজায় ঘুরতেন গুরমিত। হাতে থাকত নিজের ছবি ও পোর্টফোলিও। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে বারবার বাস বদলাতে হতো। অর্থ বাঁচাতে খাবারের ক্ষেত্রেও করতে হতো আপস। কখনো কখনো দুপুরের খাবার বলতে ছিল কয়েকটি বিস্কুট। এভাবেই এমন সময়ও গেছে, যখন প্রতিদিন মাত্র ৩৬ রুপিতে তাঁকে চলতে হয়েছে।

এই কঠিন সময়েই গুরমিতের জীবনে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনকল। চলচ্চিত্র নির্মাতা যশ চোপড়া তাঁকে টেলিভিশনে কাজ করার পরামর্শ দেন। সেই পরামর্শ তাঁর ক্যারিয়ারের গতিপথ বদলে দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে। অভিনয়ের সুযোগের জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করার পর অবশেষে আসে সেই কাজ, যা গুরমিতকে দর্শকের কাছে পরিচিত করে দেয়—‘রামায়ণ’।

রাম চরিত্রে অভিনয় করে গুরমিত ঘরে ঘরে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এরপর ‘গীত-হুই সবসে পারায়ি’-এর মান সিং খুরানা চরিত্র তাঁকে তরুণ দর্শকদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় করে। ‘পুনর্বিবাহ’ও তাঁর জনপ্রিয়তা ধরে রাখে। নাচের রিয়েলিটি শো ‘ঝলক দিখলা জা’-তেও অংশ নিয়ে সাফল্য পান তিনি। তবে তিনি শুধু ছোট পর্দায় আটকে থাকতে চাননি।

২০১৫ সালে ‘খামোশিয়াঁ’ দিয়ে হিন্দি সিনেমায় অভিষেক হয় গুরমিতের। এরপর ‘মিস্টার এক্স’, ‘ওয়াজাহ তুম হো’, ‘লালি কি শাদি মে লাড্ডু দিওয়ানা’ ও ‘পল্টন’-এর মতো সিনেমায় অভিনয় করেন। তবে টেলিভিশনে যে জনপ্রিয়তা তিনি পেয়েছিলেন, সিনেমায় সেটি একই মাত্রায় রূপ নেয়নি। ‘খামোশিয়াঁ’তে তাঁর উপস্থিতি নিয়ে আগ্রহ থাকলেও ছবিটি তাঁকে বলিউডের প্রথম সারির নায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। পরে ‘পল্টন’-এর মতো ছবিতেও কাজ করেন। তাঁর সিনেমার তালিকায় ‘দ্য ওয়াইফ’-এর নামও রয়েছে। বলিউডে তাঁর ফিল্মোগ্রাফি তুলনামূলকভাবে ছোট।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গুরমিতের ক্যারিয়ারে ওটিটির ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ‘কমান্ডার করণ সাক্সেনা’ সিরিজে নামভূমিকায় অভিনয় করেন তিনি। অ্যাকশনধর্মী এই সিরিজে দর্শক তাঁকে অন্য ধরনের চরিত্রে দেখার সুযোগ পান। টেলিভিশনের রোমান্টিক বা পৌরাণিক নায়কের বাইরে গুরমিতকে অ্যাকশন চরিত্রেও নিজেকে প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছে।

২০২৬ সালে গুরমিতের সামনে সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর একটি ‘দ্য ব্যাটল অব শত্রুঘাট’। এটি ঐতিহাসিক ও যুদ্ধভিত্তিক সিনেমা। ছবিতে গুরমিতকে একজন সাহসী যোদ্ধার চরিত্রে দেখা যাবে। সঙ্গে থাকছেন সিদ্ধার্থ নিগম ও আরুশি নিশাঙ্ক। মহেশ মাঞ্জরেকর, রাজা মুরাদ ও জরিনা ওয়াহাবও অভিনয় করছেন। ছবিটি পরিচালনা করছেন শাহিদ কাজমি। এ সিনেমা নিয়ে গুরমিতও আশাবাদী। তিনি বলেছেন, ‘দ্য ব্যাটল অব শত্রুঘাট’ তাঁর জন্য একেবারে নতুন জায়গা। ভালোবাসা, যুদ্ধ, ইতিহাস ও নাটক—সব মিলিয়ে সিনেমাটিকে তিনি নিজের জন্য নতুন ধরনের অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখছেন।

অভিনয়ের বাইরে স্ত্রী দেবিনা ব্যানার্জির সঙ্গে গুরমিতের ব্যক্তিজীবনও দর্শকের আগ্রহের বিষয়। ২০২৬ সালে দুজনকে দেখা গেছে ‘তুম হো না’ অনুষ্ঠানে। সেখানে তাঁদের সম্পর্ক, বিয়ে ও দীর্ঘ সময়ের ব্যক্তিগত সংগ্রাম নিয়েও কথা বলেছেন তাঁরা। গুরমিতের এই উপস্থিতি দেখিয়েছে, অভিনয়ের পাশাপাশি এখন তিনি টেলিভিশন ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে নিজের ব্যক্তিত্বকেও সামনে আনছেন।

দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে