গান, পোশাক, নাচ, তারকাসংস্কৃতি—কীভাবে এক তরুণ গায়ক বদলে দিয়েছিলেন পপ সংস্কৃতির ভাষা; সেটা এখনো আলোচনার বিষয়। আজ ১৬ আগস্ট। ১৯৭৭ সালের এই দিনে মাত্র ৪২ বছর বয়সে মারা গিয়েছিলেন এলভিস প্রিসলি। তাঁর মৃত্যুর ৪৯ বছর পরও নামটির আগে আলাদা করে কোনো পরিচয়ের প্রয়োজন হয় না—শুধু ‘এলভিস’ বললেই যেন যথেষ্ট। সংগীতের ইতিহাসে তিনি ‘দ্য কিং’। কিন্তু এই উপাধি শুধু জনপ্রিয়তার নয়; এটি এমন এক সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের স্বীকৃতি, যার প্রভাব সংগীতের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল পোশাক, নাচ, টেলিভিশন, সিনেমা, তারকাসংস্কৃতি, এমনকি মানুষের নিজের পরিচয় প্রকাশের ধরনেও।
১৯৭৭ সালে এলভিস যখন মারা যান, তখন রক অ্যান্ড রোল আর নতুন কিছু নয়। তাঁর মৃত্যুর আগেই বিটলস, রোলিং স্টোনস, বব ডিলান, জিমি হেনড্রিক্সসহ অসংখ্য শিল্পী সংগীতের ভাষা পাল্টে দিয়েছেন। তবু এলভিসের জায়গাটি আলাদা। কারণ, তিনি শুধু একটি নতুন সংগীতধারার জনপ্রিয় মুখ ছিলেন না; তিনি দেখিয়েছিলেন একজন সংগীতশিল্পী কীভাবে একই সঙ্গে শব্দ, শরীর, পোশাক, মঞ্চ এবং গণমাধ্যম—সবকিছুকে নিজের শিল্পের অংশ করে তুলতে পারেন।
রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমের ভাষায়, ১৯৫৪ সালে এলভিস ব্লুজ, কান্ট্রি, আরঅ্যান্ডবি, পপ ও গসপেলের নানা উপাদান একত্র করে এমন এক সংগীত ও পারফরম্যান্সের বিস্ফোরণ ঘটান, যা রক অ্যান্ড রোলকে মূলধারার সংস্কৃতিতে নিয়ে যায়। তাই প্রশ্নটা আজও প্রাসঙ্গিক—৪৯ বছর পরও কেন এলভিস ‘দ্য কিং’?
শুরুটা ছিল খুব সাধারণ
এলভিস অ্যারন প্রিসলির জন্ম ১৯৩৫ সালের ৮ জানুয়ারি, মিসিসিপির টুপেলোতে। দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা এই ছেলেটির শৈশব কেটেছিল গসপেল, ব্লুজ ও কান্ট্রি সংগীতের আবহে। পরে মেমফিসে গিয়ে তাঁর সংগীতের জগৎ আরও বিস্তৃত হয়। সেখানে তিনি কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীদের ব্লুজ ও আরঅ্যান্ডবি যেমন শুনেছেন, তেমনি শুনেছেন সাদা শিল্পীদের কান্ট্রি ও গসপেল। কান্ট্রি মিউজিক হল অব ফেমও তাঁর সংগীতকে কান্ট্রি, আরঅ্যান্ডবি, কৃষ্ণাঙ্গ ও শ্বেতাঙ্গ গসপেল এবং জনপ্রিয় সংগীতের এক মিশ্রণ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
১৯৫৪ সালে সান রেকর্ডসে গিয়ে ‘দ্যাটস অল রাইট’ রেকর্ড করার সময় তিনি তখনো অখ্যাত। কিন্তু সেই রেকর্ডেই যেন ভবিষ্যতের এলভিসের আভাস পাওয়া গেল। এটি নিছক নতুন কোনো গান ছিল না। বরং পুরোনো আমেরিকান সংগীতের নানা ধারাকে নতুন প্রজন্মের শরীরী উত্তেজনা ও ছন্দের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল সেখানে।
১৯৫৫ সালে তাঁর রেকর্ডিং চুক্তি আরসিএর হাতে যাওয়ার পর বদলে গেল পরিস্থিতি। ১৯৫৬ সালের শুরুতে ‘হার্টব্রেক হোটেল’ তাঁকে জাতীয় তারকায় পরিণত করে। গানটি অল্প সময়েই ১০ লাখ কপি বিক্রি করেছিল।
এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি।
গান ছিল তাঁর প্রথম বিপ্লব
এলভিসকে শুধু ‘রক অ্যান্ড রোলের রাজা’ বললে তাঁর সংগীতের ব্যাপ্তি কমিয়ে দেখা হয়। তিনি একদিকে ‘হাউন্ড গড’, ‘জেলহাউস রক’, ‘ব্লু সুইয়েড শুজ’-এর মতো গান দিয়ে রক অ্যান্ড রোলের উন্মাদনা তৈরি করেছেন; অন্যদিকে গেয়েছেন প্রেমের গান, গসপেল, কান্ট্রি ও ব্যালাড। ‘সাসপিশাস মাইন্ডস’, ‘কান্ট হেল্প ফলিং ইন লাভ’, ‘লাভ মি টেন্ডার’, ‘আর ইউ লোনসাম টুনাইট?—প্রতিটি গান তাঁর আলাদা একেকটি রূপ তৈরি করেছে।
কান্ট্রি মিউজিক হল অব ফেমের তথ্য অনুযায়ী, এলভিস পুরো ক্যারিয়ারজুড়েই কান্ট্রি সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দেশটির কান্ট্রি চার্টেও তাঁর প্রভাব ছিল। অর্থাৎ তিনি কোনো একটি ঘরানায় আটকে ছিলেন না। বরং তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ঘরানার সীমা ভাঙা।
এই কারণেই তাঁর সংগীত পরবর্তী প্রজন্মের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। রক অ্যান্ড রোলের ইতিহাসে এলভিসকে আলাদা করে দেখার অন্যতম কারণ হলো—তিনি আগে থেকে থাকা বিভিন্ন সংগীতধারাকে এমনভাবে একত্র করেছিলেন, যা সাদা আমেরিকার বিশাল শ্রোতাদের কাছে কৃষ্ণাঙ্গ-প্রভাবিত সংগীতকে পৌঁছে দেয়।
এখানেই অবশ্য তাঁর উত্তরাধিকারের সবচেয়ে বড় বিতর্কও তৈরি হয়।
‘তিনি কি কৃষ্ণাঙ্গ সংগীত চুরি করেছিলেন?’
আজকের চোখে এলভিসকে বিচার করতে গেলে এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, তাঁর সংগীতের শিকড়ের বড় অংশই কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীদের তৈরি ব্লুজ, আরঅ্যান্ডবি ও গসপেলে। আর্থার ‘বিগ বয়’ ক্রুডাপ, বিগ মামা থর্নটন, সিস্টার রোজেটা থার্প, বি বি কিংসহ অসংখ্য কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পী যে সংগীতভাষা তৈরি করেছিলেন, এলভিস সেটিকে নতুন শ্রোতাগোষ্ঠীর কাছে নিয়ে যান।
কিন্তু সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ছিল বর্ণবৈষম্যে গভীরভাবে বিভক্ত। ফলে কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীদের তৈরি সংগীত যখন শ্বেতাঙ্গ শিল্পীর কণ্ঠে মূলধারার বাজারে প্রবেশ করল, তখন অর্থনৈতিক লাভ ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির প্রশ্নটি সামনে আসা স্বাভাবিক।
এ কারণেই এলভিসকে ঘিরে সাংস্কৃতিক আত্মসাতের বিতর্ক বহু বছর ধরে চলছে। দ্য নিউইয়র্কারের একটি বিশ্লেষণেও তাঁর কৃষ্ণাঙ্গ সংগীতের ওপর নির্ভরতা এবং সেই সংগীতের মূল স্রষ্টাদের তুলনামূলক কম স্বীকৃতি ও আর্থিক লাভের বিষয়টি তাঁর উত্তরাধিকারের জটিল অংশ হিসেবে উঠে এসেছে।
.তবে পুরো বিষয়টিকে শুধু ‘এলভিস কৃষ্ণাঙ্গ সংগীত চুরি করেছিলেন’—এমন সরল সমীকরণেও নামিয়ে আনা যায় না। তাঁর জীবনী ও ক্যারিয়ারের বিভিন্ন পর্যায়ে কৃষ্ণাঙ্গ শিল্পীদের প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা, তাঁদের সংগীতের প্রকাশ্য স্বীকৃতি এবং বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থানের দিকও সামনে এসেছে। মেমফিসের কৃষ্ণাঙ্গ সংবাদপত্রগুলোও তাঁকে অনেক সময় সম্ভাব্য মিত্র হিসেবে দেখেছিল বলে ঐতিহাসিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি এলভিসের মর্যাদা কমায় না। বরং তাঁর সময়কে আরও সম্পূর্ণভাবে বুঝতে সাহায্য করে।
কেন তাঁর গান ‘বিস্ফোরক’
এলভিসের গান যতটা বিপ্লবী, তাঁর শরীরী ভাষা সম্ভবত তার চেয়েও বেশি বিস্ফোরক ছিল। ১৯৫০-এর দশকের আমেরিকায় একজন তরুণ পুরুষ মঞ্চে উঠে কোমর দোলাচ্ছেন, শরীর বাঁকাচ্ছেন, চোখ ও মুখের অভিব্যক্তি দিয়ে গানকে অভিনয় করছেন—এ দৃশ্য ছিল অনেকের কাছে অস্বস্তিকর।
এলভিসের নাচকে অনেকে অশ্লীল বলেছিলেন। টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ তাঁর শরীরের নড়াচড়া নিয়ে আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা যত এসেছে, দর্শকের কৌতূহল তত বেড়েছে। আজকের মিউজিক ভিডিও, পপ কনসার্ট কিংবা কোরিওগ্রাফ করা স্টেজ পারফরম্যান্সে শিল্পীর শরীরকে যে পরিমাণ গুরুত্ব দেওয়া হয়, তার পূর্বসূরিদের একজন এলভিস।
তিনি যেন বলে দিয়েছিলেন—গান শুধু কানে শোনার বিষয় নয়; চোখেও দেখতে হয়। এখান থেকেই আধুনিক পপ তারকার ধারণার একটি বড় অংশ তৈরি হয়।
পোশাকও হয়ে গেল পরিচয়ের ভাষা
এলভিসের পোশাক নিয়ে কথা বললে শুধু তাঁর বিখ্যাত জাম্পস্যুটের কথা বললেই শেষ হয় না। পঞ্চাশের দশকের রঙিন জ্যাকেট, আঁটসাঁট প্যান্ট, পম্পাডোর চুল, সাইডবার্ন—সবকিছু মিলিয়ে তিনি তরুণ পুরুষের প্রচলিত চেহারাকে বদলে দিয়েছিলেন। তাঁর পোশাক বলত—মঞ্চের তারকা সাধারণ মানুষের মতো দেখতে হবে না।
আর ষাট ও সত্তরের দশকে সেই চেহারা আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে। ঝলমলে জাম্পস্যুট, কেপ, গয়না, বড় কলার—শেষের দিকের এলভিস যেন আর শুধু গায়ক নন, নিজেই একটি দৃশ্য।
রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমও তাঁর রূপান্তরকে ‘এজি হিলবিলি ক্যাট’ থেকে ব্যালাড গায়ক, পরে ক্যাপ পরা ঝলমলে শোম্যান হিসেবে বর্ণনা করেছে। আজকের মঞ্চে শিল্পীর পোশাক যখন ব্র্যান্ড, পরিচয় ও ব্যক্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ, তখন তার শিকড়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন এলভিস।
.টেলিভিশন বুঝেছিলেন তিনি
এলভিসের সাফল্যের আরেকটি বড় রহস্য—তিনি সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী নতুন মাধ্যম টেলিভিশনের ভাষা বুঝেছিলেন। রেকর্ড বিক্রি তাঁকে তারকা বানিয়েছিল, কিন্তু টেলিভিশন তাঁকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। একটি প্রজন্ম তাঁকে শুধু শুনত না, দেখত।
এটি ছিল বিরাট পরিবর্তন। কারণ, তারকা তখন আর কেবল কণ্ঠস্বর নয়। তারকার চুল, মুখ, শরীর, পোশাক, হাসি, হাঁটা—সবকিছুই বাজারজাতযোগ্য। এই জায়গাতেই এলভিস আধুনিক তারকা সংস্কৃতির অন্যতম পূর্বসূরি।
তাঁর তিনটি বড় টেলিভিশন বিশেষ অনুষ্ঠান—‘এলভিস’ (১৯৬৮), ‘আলোহা ফ্রম হাওয়াই, ভায়া স্যাটেলাইট’ (১৯৭৩) এবং ‘এলভিস ইন কনসার্ট’—ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ‘আলোহা ফ্রম হাওয়াই’ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে একসঙ্গে একজন সংগীতশিল্পীর অনুষ্ঠান পৌঁছে দেওয়া—আজকের লাইভ স্ট্রিমিং যুগে বিষয়টি স্বাভাবিক মনে হলেও তখন এটি ছিল বিরাট ঘটনা।
সিনেমাতেও ছিলেন, কিন্তু সব সময় নিজের সেরা ব্যবহার করতে পারেননি
এলভিস শুধু গায়ক নন, অভিনেতাও ছিলেন। তাঁর ৩০টির বেশি পূর্ণদৈর্ঘ্য সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। গ্রেসল্যান্ডের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ৩১টি ফিচার চলচ্চিত্রে অভিনেতা হিসেবে এবং দুটি কনসার্ট ডকুমেন্টারিতে অংশ নেন। হলিউডে তিনি ছিলেন বড় তারকা। কিন্তু এখানেই তাঁর ক্যারিয়ারের একটি অপূর্ণতার গল্প আছে।
একসময় এলভিসের সিনেমাগুলো বাণিজ্যিকভাবে সফল হলেও অনেক চলচ্চিত্র ছিল ফর্মুলাভিত্তিক। গান, রোমান্স, হাস্যরস—সব মিলিয়ে তাঁকে একটি নিরাপদ তারকা-ইমেজের মধ্যে আটকে ফেলা হয়েছিল।
যে শিল্পী সংগীতে এত বড় ঝুঁকি নিয়েছিলেন, সিনেমায় তাঁকে ততটা স্বাধীনতা দেওয়া হয়নি। ফলে তাঁর অভিনয় প্রতিভার সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগেনি—এমন মূল্যায়নও দীর্ঘদিন ধরে আছে।
.আরেক এলভিসের জন্ম হয়েছিল ১৯৬৮ সালে
ষাটের দশকের মাঝামাঝি এসে এলভিসের ক্যারিয়ারে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল। তাঁর সিনেমার সূত্রবদ্ধতা, বদলে যাওয়া সংগীতের বাজার এবং নতুন প্রজন্মের বিটলস, রোলিং স্টোনস, বব ডিলানদের উত্থান তাঁকে আগের মতো কেন্দ্রীয় জায়গায় রাখছিল না। তখন এল ১৯৬৮। ‘৬৮ কামব্যাক কনসার্ট’ যেন পুরোনো এলভিসকে নতুন করে আবিষ্কার করল। কালো চামড়ার পোশাকে, তুলনামূলক ঘনিষ্ঠ পরিবেশে, নিজের পুরোনো গান ও নতুন উদ্দীপনা নিয়ে তিনি ফিরে এলেন।
এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি মুহূর্ত। কারণ এলভিস দেখালেন, কিংবদন্তি হয়ে থাকার জন্য শুধু পুরোনো সাফল্যের ওপর ভর করে থাকা যায় না—নিজেকেও নতুন করে আবিষ্কার করতে হয়। এর পরের বছর লাস ভেগাসে তাঁর মঞ্চজীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
এলভিস তখন আর পঞ্চাশের দশকের তরুণ রক অ্যান্ড রোলার নন। তিনি হয়ে উঠেছেন বড় মাপের মঞ্চশিল্পী—ব্যান্ড, অর্কেস্ট্রা, ঝলমলে পোশাক, আলো এবং বিশাল দর্শকসমাগমের কেন্দ্রবিন্দু।
‘দ্য কিং’—উপাধিটি এল কোথা থেকে?
এলভিস নিজে ‘কিং’ উপাধি তৈরি করেননি। এটি সময়ের সঙ্গে তাঁর চারপাশে তৈরি হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাঁর মৃত্যুর পর উপাধিটি আরও শক্তিশালী হয়েছে। কারণ, মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তিনি বাস্তব মানুষ থেকে সাংস্কৃতিক প্রতীকে পরিণত হন। আজ আমরা ‘এলভিস’কে একসঙ্গে কয়েকভাবে দেখি—একজন গায়ক, একজন অভিনেতা, একজন আবেদনময়ী শিল্পীর প্রতীক, একজন ফ্যাশন আইকন, একজন শোম্যান, আবার একই সঙ্গে অতিরিক্ত মাদকনির্ভরতা ও খ্যাতির চাপের করুণ উদাহরণ হিসেবেও।
কিংবদন্তির অন্ধকার দিকও আছে
এলভিসের মৃত্যুর গল্প তাঁর জীবনের মতোই আলোচিত। ১৯৭৭ সালের ১৬ আগস্ট মেমফিসের গ্রেসল্যান্ডে তাঁর মৃত্যু হয়। বয়স হয়েছিল মাত্র ৪২। শেষ বছরগুলোতে তাঁর শারীরিক অবস্থা খারাপ হচ্ছিল। প্রেসক্রিপশন ওষুধের ওপর নির্ভরতা, অতিরিক্ত ওজন, ক্লান্তি এবং অনিয়মিত জীবনযাপন তাঁর শরীর ও কর্মজীবনে প্রভাব ফেলেছিল।
তাঁর মৃত্যুর পরও এই প্রশ্নগুলো তাঁর উত্তরাধিকারের অংশ হয়ে আছে—এত বিশাল খ্যাতি কি একজন মানুষকে শেষ পর্যন্ত নিজের কাছ থেকেই বিচ্ছিন্ন করে দেয়? এলভিসের জীবনের আরেকটি বিতর্কিত অধ্যায় তাঁর ম্যানেজার কর্নেল টম পার্কারের ভূমিকা। পার্কার তাঁর ক্যারিয়ারকে বাণিজ্যিকভাবে অসাধারণ উচ্চতায় নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলেন, কিন্তু তাঁদের সম্পর্কের অর্থনৈতিক দিক ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে বহু প্রশ্নও উঠেছে।
অর্থাৎ ‘দ্য কিং’-এর সাম্রাজ্যের পেছনে ছিল এক বিশাল ব্যবসায়িক যন্ত্র। আর সেই যন্ত্রের কেন্দ্রে থাকা মানুষটি শেষ পর্যন্ত নিজের জীবনের ওপর কতটা নিয়ন্ত্রণ রাখতে পেরেছিলেন—এ প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়।
এলভিসের সঙ্গে ‘তারকা’ শব্দটির অর্থও বদলে যায়
এলভিস প্রিসলি ‘সুপারস্টার’ ধারণাকে এক নতুন মাত্রা দেন। তাঁর ব্যক্তিজীবন মানুষের আগ্রহের বিষয় হয়ে ওঠে। তিনি কোথায় থাকেন, কী পরেন, কার সঙ্গে সম্পর্ক, কী গাড়ি চালান—সবকিছু খবর।
গ্রেসল্যান্ড শুধু একটি বাড়ি নয়; এটি হয়ে ওঠে তাঁর ব্যক্তিত্বের সম্প্রসারণ। আজ কোনো পপ তারকার বাড়ি, পোশাক, গাড়ি, ব্যক্তিগত সামগ্রী কিংবা জীবনযাপনকে ঘিরে পর্যটন ও বাণিজ্য গড়ে ওঠা অস্বাভাবিক নয়। এলভিস এই তারকাসংস্কৃতির প্রাথমিক বড় উদাহরণগুলোর একজন আর মৃত্যুর পরও সেই ব্যবসা থামেনি। গ্রেসল্যান্ডের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর রেকর্ডের বিশ্বব্যাপী বিক্রি এক বিলিয়নেরও বেশি বলে অনুমান করা হয়। তাঁর সংগীত ভিনাইল থেকে ক্যাসেট, সিডি হয়ে ডিজিটাল যুগেও বাজারে সক্রিয় থেকেছে।
মৃত মানুষটি কীভাবে আবার মঞ্চে ফেরেন?
এলভিসের উত্তরাধিকারের সবচেয়ে অবিশ্বাস্য দিকগুলোর একটি হলো—তিনি মৃত্যুর পরও যেন ‘পারফর্ম’ করে চলেছেন। তাঁর পুরোনো রেকর্ড নতুন করে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর গান নতুন প্রজন্ম শুনেছে। তাঁর কণ্ঠ অন্য শিল্পীদের অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁকে নিয়ে চলচ্চিত্র, তথ্যচিত্র, বই, প্রদর্শনী তৈরি হয়েছে। এমনকি তাঁর ভিডিও ও রেকর্ডিং ব্যবহার করে মৃত্যুর পরও মঞ্চে ‘এলভিস’-কে হাজির করার নানা আয়োজন হয়েছে।
এ কারণেই পৃথিবীর নানা প্রান্তে আজও এলভিসের অনুকরণকারী শিল্পী তৈরি হন। এমনকি ২০২৬ সালেও গ্রেসল্যান্ডে ‘আলটিমেট এলভিস ট্রিবিউট আর্টিস্ট কনটেস্ট’ অনুষ্ঠিত হয়েছে—যেখানে নতুন প্রজন্মের পারফরমাররা এলভিসের কণ্ঠ, পোশাক ও শরীরী ভাষা পুনর্নির্মাণ করে তাঁর উত্তরাধিকার উদ্যাপন করছেন।
একজন শিল্পীর মৃত্যুর ৪৯ বছর পরও তাঁর নামে এমন প্রতিযোগিতা চলা নিজেই বলে দেয়, ‘এলভিস’ এখন আর শুধু একজন মানুষের নাম নয়।
নতুন প্রজন্ম কেন তাঁকে আবার আবিষ্কার করছে?
এলভিসকে বোঝার সবচেয়ে মজার বিষয় হলো—তাঁকে টিকিয়ে রেখেছে শুধু তাঁর সমসাময়িক ভক্তরা নয়। নতুন প্রজন্মের কাছেও তিনি বারবার ফিরে আসছেন।
এর একটি কারণ তাঁর চেহারা। আজকের ভিজ্যুয়াল সংস্কৃতিতে এলভিসের সিলুয়েট খুব সহজে চেনা যায়—উঁচু চুল, সাইডবার্ন, ঝলমলে পোশাক, মাইক্রোফোন হাতে মঞ্চভঙ্গি। আরেকটি কারণ তাঁর সংগীতের সরল শক্তি। তাঁর অনেক গান এমনভাবে তৈরি, যা কয়েক দশক পরও শ্রোতার কাছে সরাসরি পৌঁছে যায়।
সবশেষে আছে তাঁর গল্প। দারিদ্র্য থেকে খ্যাতি, অখ্যাতি থেকে বিশ্বজয়, যৌবনের উন্মাদনা থেকে অতিরিক্ত ভোগ, পুনরুত্থান থেকে পতন—এলভিসের জীবন নিজেই যেন একটি পূর্ণাঙ্গ আমেরিকান নাটক। এ কারণেই তাঁর জীবন নিয়ে আলোচনা কখনো পুরোনো হয় না। আর অবধারিতভাবেই ‘দ্য কিং’ তকমাও চিরস্থায়ী রূপ পায়।
বিলবোর্ড, ভোগ, আইএমডিবি ও রোলিং স্টোন অবলম্বনে