বাঙালির প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ভাতের অবস্থান কেন্দ্রীয়। তবে ওজন কমানো কিংবা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের কথা মাথায় রেখে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, ভাত কি পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া উচিত? বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল ভাত খাওয়াই সমস্যা নয়, বরং কতটুকু খাচ্ছেন, কীসের সঙ্গে খাচ্ছেন এবং দিনের কোন সময়ে খাচ্ছেন—এই বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, শরীর দিনের বিভিন্ন সময়ে খাবার ও গ্লুকোজ একইভাবে প্রক্রিয়াজাত করে না। দিনের শুরুতে এবং দুপুরের দিকে ইনসুলিন সংবেদনশীলতা তুলনামূলকভাবে ভালো থাকে। ফলে ভাতের মতো কার্বোহাইড্রেট সমৃদ্ধ খাবার দিনের বেলা খেলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।

দুপুরের খাবারে ভাত রাখা ওজন নিয়ন্ত্রণ বা রক্তে শর্করা সামলানোর ক্ষেত্রে একটি ভালো বিকল্প হতে পারে। কারণ এই সময়ে শরীর সাধারণত বেশি সক্রিয় থাকে এবং খাবার থেকে প্রাপ্ত শক্তি কাজে লাগানোর সুযোগ বেশি থাকে। তবে মনে রাখতে হবে, কেবল দুপুরে ভাত খেলেই ওজন কমবে না; সারাদিনের মোট ক্যালোরি গ্রহণ, খাবারের পরিমাণ এবং শারীরিক পরিশ্রমের বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

রাতে ভাত খাওয়া কি ক্ষতিকর? এই প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ওজন বাড়া বা কমার ক্ষেত্রে সময়ের চেয়ে মোট ক্যালোরি, খাবারের পরিমাণ এবং সামগ্রিক খাদ্যতালিকার ভূমিকা বেশি। তবে রাতে খুব দেরিতে বা ঘুমানোর ঠিক আগে অধিক পরিমাণে ভাত খাওয়া এড়িয়ে চলা উচিত। বিশেষ করে যাদের ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন প্রতিরোধের সমস্যা রয়েছে, তাদের খাবারের সময় ও পরিমাণ নিয়ে আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন।

সাদা ভাতে থাকা সহজে হজমযোগ্য কার্বোহাইড্রেটের কারণে খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত বাড়তে পারে। তবে এই প্রভাব ব্যক্তিভেদে, ভাতের ধরন, পরিমাণ এবং সঙ্গে খাওয়া অন্যান্য খাবারের ওপর নির্ভর করে। একটি ছোট পরিসরের গবেষণায় দেখা গেছে, একই পরিমাণ ভাত ভিন্ন ভিন্ন সময়ে খেলে রক্তে শর্করার প্রতিক্রিয়ায় পার্থক্য হতে পারে, তবে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

রক্তে শর্করার প্রভাব কমাতে ভাত একা না খেয়ে সুষম খাবারের সঙ্গে খাওয়া শ্রেয়। যেমন— ভাতের সঙ্গে মাছ, ডিম বা মুরগির মতো প্রোটিন, পর্যাপ্ত সবজি, শাক এবং ডাল রাখা। পাশাপাশি ভাতের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা এবং অতিরিক্ত তেল বা চর্বিযুক্ত তরকারি এড়িয়ে চলা উচিত। কার্বোহাইড্রেটের সঙ্গে প্রোটিন ও খাদ্যআঁশ থাকলে পুষ্টিমান বাড়ে এবং দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকে।

সাদা চালের পরিবর্তে লাল বা বাদামি চালের ব্যবহার রক্তে গ্লুকোজের প্রভাব কমাতে সহায়ক হতে পারে, কারণ এগুলোতে খাদ্যআঁশ বেশি থাকে এবং এগুলো ধীরে হজম হয়। তবে চালের ধরন বদলালেও পরিমাণের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।

ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ভাত পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। রক্তে শর্করার মাত্রা, ওষুধ এবং শারীরিক কর্মকাণ্ডের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকা নির্ধারণ করা উচিত। টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ওপর করা একটি গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ক্ষেত্রে বাদামি চাল গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে সুবিধা দেয়।

ওজন কমাতে চাইলে কেবল ভাতের সময়ের চেয়ে সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের দিকে নজর দেওয়া বেশি জরুরি। প্রয়োজনের তুলনায় ক্যালোরি গ্রহণ না করা, প্রতিদিন পর্যাপ্ত শারীরিক পরিশ্রম করা এবং ভাতের সঙ্গে সবজি ও প্রোটিনের ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন। রাতে ভাত খেলেও যদি মোট ক্যালোরি সীমার মধ্যে থাকে এবং খাবারটি সুষম হয়, তবে শুধু সময়ের কারণে ওজন বাড়বে এমনটা বলা সঠিক নয়।

পরিশেষে, ওজন ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের জন্য দুপুরে বা দিনের শুরুর দিকে পরিমিত ভাত খাওয়া সুবিধাজনক। রাতে খেতে হলে পরিমাণ কমিয়ে আনা এবং ঘুমানোর ঠিক আগে না খাওয়াই শ্রেয়। পরিমিত ভাত, পর্যাপ্ত সবজি, প্রোটিন এবং নিয়মিত শরীরচর্চাই সুস্থ থাকার চাবিকাঠি।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া