ঝালকাঠি জেলার চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি। অকৃতকার্য হওয়া এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং সাতটি দাখিল মাদ্রাসা রয়েছে। এই বিপর্যয়ের পর প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদানের মান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি এবং ভৌত অবকাঠামো নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি।

জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ঝালকাঠি সদর উপজেলার দুটি, নলছিটি উপজেলার তিনটি এবং কাঁঠালিয়া উপজেলার চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কোনো পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

সদর উপজেলার শাওরাকাঠী নব আদর্শ মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে মোট ২৩৪ জন শিক্ষার্থী থাকলেও এ বছর পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ২৩ জনের সবাই ফেল করেছে। উল্লেখ্য, গত বছর এই বিদ্যালয় থেকে ১৮ জন পরীক্ষা দিয়ে মাত্র একজন পাস করেছিল। বর্তমানে এখানে ১৪ জন শিক্ষক ও তিনজন কর্মচারী কর্মরত আছেন।

একই উপজেলার মোস্তফাবাদ কাসেমিয়া দাখিল মাদ্রাসায় ২৫২ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। এ বছর ১৩ জন পরীক্ষার্থীর সবাই অকৃতকার্য হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে ১৩ জন শিক্ষক ও তিনজন কর্মচারীসহ মোট ১৬ জন কর্মরত আছেন, যাদের পেছনে সরকারি কোষাগার থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা ব্যয় হয়। তবে ২০২৫ সালের দাখিল পরীক্ষায় এই প্রতিষ্ঠানের ১১ জনের মধ্যে ৯ জন পাস করেছিল।

নলছিটি উপজেলার সূর্যপাশা দাখিল মাদ্রাসা (১৭ জন পরীক্ষার্থী, ১৩ জন শিক্ষক-কর্মচারী), রানাপাশা হোসাইনিয়া হাসেমিয়া দাখিল মাদ্রাসা (১৬ জন পরীক্ষার্থী, ১৬ জন শিক্ষক-কর্মচারী) এবং পশ্চিম কয়া আহম্মদিয়া দাখিল মাদ্রাসা (১৬ জন পরীক্ষার্থী, ১৪ জন শিক্ষক-কর্মচারী)—এই তিনটি মাদ্রাসা থেকে মোট ৪২ জন পরীক্ষা দিয়ে একজনও পাস করতে পারেনি।

অন্যদিকে, কাঁঠালিয়া উপজেলার বাঁশবুনিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে ২৫ জন, ঝোড়খালী দারুলহুদা গফুরিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে ২৪ জন, দত্তের পশারিবুনিয়া দাখিল মাদ্রাসা থেকে ১৬ জন এবং বানাই রাবেয়া বালিকা বিদ্যালয় থেকে ৬ জন পরীক্ষার্থী শতভাগ ফেল করেছেন। এছাড়া রাজাপুর উপজেলার এসজিএস সেকেন্ডারি স্কুলের ১২ জনের মধ্যে মাত্র একজন এবং নলছিটির পশ্চিম গোপালপুর হাইস্কুলের ১৪ জনের মধ্যে মাত্র একজন পাস করেছে।

ফলাফলের এই বিপর্যয় নিয়ে প্রতিষ্ঠানপ্রধানরা বিভিন্ন কারণ দেখিয়েছেন। মোস্তফাবাদ কাসেমিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার কে এম আব্দুল্লাহ বলেন, "এবারের ব্যাচটি দুর্বল ছিল। তাছাড়া অ্যান্ড্রয়েড মোবাইলের আসক্তির কারণে শিক্ষার্থীরা ক্লাসে আসে না, পড়ালেখাও করে না।"

সূর্যপাশা দাখিল মাদ্রাসার সুপার মাওলানা আলাউদ্দীন দাবি করেন, "পরীক্ষার নতুন কারিকুলাম ও কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা ভীত হয়ে পড়েছিল, তবে পাঠদানে কোনো ঘাটতি ছিল না।"

রানাপাশা হোসাইনিয়া হাসেমিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার মো. আবুল বাসার জানান, তিনি দীর্ঘ ৯ বছর বরখাস্ত থাকায় শিক্ষকসংকটের কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে। আর পশ্চিম কয়া আহম্মদিয়া দাখিল মাদ্রাসার সুপার মো. মনিরুজ্জামান দাবি করেন, নতুন ভবনের নির্মাণকাজ চলায় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগী হতে পারেনি।

রাজাপুর উপজেলার এসজিএস সেকেন্ডারি বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক রহিমা আক্তার বলেন, "আমাদের ভবনটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় অভিভাবকেরা সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে চান না। অনেক সময় আতঙ্কের মধ্যেই ক্লাস নিতে হয়। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত না আসায় ফলেও ধস নেমেছে।"

তবে অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি ভিন্ন। তাদের অভিযোগ, এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস হয় না এবং শিক্ষকদের উপস্থিতিও সন্তোষজনক নয়। নথিতে আড়াই শতাধিক শিক্ষার্থী দেখানো হলেও বাস্তবে ক্লাসে চার-পাঁচজনের বেশি শিক্ষার্থী থাকে না।

এই বিষয়ে ঝালকাঠির জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু ছাঈদ জানান, কী কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোতে সব শিক্ষার্থী ফেল করেছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। আগামীতে ভালো ফলাফলের জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা দেওয়া হবে।