সংসারের চরম অভাব-অনটনের কারণে অষ্টম শ্রেণির পর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল আলী আকবরের। দীর্ঘ চার দশক পর জীবনের এই পর্যায়ে এসে সেই অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করলেন তিনি। ৫৪ বছর বয়সে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৪.৩৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন নাটোরের বাগাতিপাড়ার বাসিন্দা আলী আকবর।

রাজশাহীর নওহাটা সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি উচ্চবিদ্যালয়ের কারিগরি শাখার ‘বিল্ডিং মেইনটেন্যান্স’ ট্রেড থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন তিনি। পেশায় একটি বেসরকারি হাসপাতালের কর্মচারী আলী আকবরের এই অনন্য সাফল্যে পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইছে।

ছয় ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে দ্বিতীয় আলী আকবরের পড়াশোনার শুরু হয়েছিল গ্রামের একটি মাদ্রাসায়। তবে ১৯৮৮ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় পরিবারের আর্থিক সংকটের মুখে লেখাপড়া ছেড়ে দিতে হয় তাকে। এরপর বাবাকে সহযোগিতা করতে ক্ষুদ্র ব্যবসায় যুক্ত হন এবং ১৯৯০ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

পরবর্তীতে স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে রাজশাহীতে চলে আসেন আলী আকবর। সেখানে তিনি ও তার স্ত্রী একটি বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি শুরু করেন। সীমিত আয়ের মধ্যেও সন্তানদের শিক্ষার ব্যাপারে ছিলেন তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তার মেয়ে ২০১৫ সালে নার্সিং পড়াশোনা শেষ করেন এবং ছেলে ইসমাইল হোসেন ২০১৯ সালে এমবিবিএস পাস করেন। পরবর্তীতে ৪২তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে সরকারি চিকিৎসক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন ইসমাইল হোসেন।

সন্তানরা স্বাবলম্বী হওয়ার পর আলী আকবর পুনরায় পড়াশোনা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন। স্ত্রী ও সন্তানদের উৎসাহ ও সহযোগিতায় তিনি স্কুলে ভর্তি হন। চাকরির পাশাপাশি বয়সের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে নিষ্ঠার সঙ্গে পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি এবং অবশেষে জিপিএ ৪.৩৫ অর্জন করেন।

নিজের এই সাফল্য সম্পর্কে আলী আকবর বলেন, "পড়াশোনার জন্য বয়স কোনো বাধা নয়। ইচ্ছাশক্তি, মনোবল ও অধ্যবসায় থাকলে সাফল্য অর্জন সম্ভব—আমি নিজের জীবন দিয়ে সেটাই দেখাতে চেয়েছি।"

বর্তমান শিক্ষা পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, "এখন অনেক শিক্ষার্থী মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত সময় কাটিয়ে পড়ালেখার ক্ষতি করছে। আমি আমার সন্তানদের ক্ষেত্রে পড়াশোনাকে সবসময় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। ছেলে মেডিকেল কলেজের তৃতীয় বর্ষে ওঠার পর এবং মেয়ে নার্সিং শেষ করার পর তাদের হাতে মোবাইল ফোন দেওয়া হয়েছিল।"

বাবার এই অর্জনে গর্বিত ছেলে ইসমাইল হোসেন। তিনি বলেন, "বাবা অনেক দিন ধরেই আবার পড়াশোনা করার কথা বলতেন। পরিবারের সবাই তাকে উৎসাহ দিয়েছেন এবং স্কুলে ভর্তি থেকে শুরু করে পড়ার বিভিন্ন কাজে সাহায্য করেছেন। বাবা এসএসসি পাস করায় আমরা ভীষণ খুশি ও গর্বিত। আমরা চাই বাবা যেন উচ্চশিক্ষার পথেই এগিয়ে যান।"