বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির পেছনে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। সোমবার বেলা ১১টার দিকে বরিশালের গৌরনদী ক্যাথলিক চার্চ পরিদর্শন শেষে বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক আন্তধর্মীয় সংলাপে তিনি এই কথা বলেন।

সংলাপে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, "বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছেন। সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতির যে চর্চা দেশে রয়েছে, গৌরনদীর আন্তধর্মীয় সংলাপেও তার প্রতিফলন ঘটেছে।"

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় স্বাধীনতার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, "ধর্মীয় স্বাধীনতার ধারণাটি যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও আগে থেকে চলে আসছে। দেশটি প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস স্বাধীনভাবে চর্চার সুযোগের আশায় যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হয়েছিলেন। এ কারণে ধর্মীয় স্বাধীনতা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।"

তিনি আরও উল্লেখ করেন, "প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে এবং বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির পক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। ধর্মীয় স্বাধীনতা যুক্তরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম মূলনীতি। প্রত্যেক মানুষ যেন কোনো ধরনের নিপীড়ন বা সহিংসতার ভয় ছাড়াই নিজ নিজ ধর্ম পালন করতে পারেন, সে লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্র কাজ করে যাচ্ছে।"

ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্ব প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, "ধর্মীয় সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা সহজ নয়। এটি রক্ষায় ধর্মীয় নেতাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ধর্মীয় বিরোধ দেখা দিলে তা যেন বড় কোনো সংঘাতে রূপ না নেয়, সেদিকে স্থানীয় ও ধর্মীয় নেতাদের সতর্ক থাকতে হবে।"

এছাড়া ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’—এই ধারণাকে একটি চমৎকার উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রেও বর্তমানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের উৎসব সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

একই অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এম জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে একটি অর্থনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংগ্রামকে সমৃদ্ধ অর্থনীতিতে রূপ দিতে হলে দেশে সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন এবং এর জন্য সব নাগরিকের মধ্যে ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা জরুরি। তিনি আরও বলেন, "ধর্মীয় সম্প্রীতি শুধু সুখ-শান্তির বিষয় নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। দেশে সামাজিক স্থিতিশীলতা থাকলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও গতিশীল হয়।"

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তথ্যমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ তৈরি পোশাক রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে এবং অনেক অভিবাসী রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট (এফডিআই) যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসে, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

চার্চের ফাদার লিটন ফ্রান্সিস গোমেজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রায় এক ঘণ্টার এই সংলাপের সঞ্চালনা করেন গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইব্রাহীম। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন আগৈলঝাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিরুপম মজুমদার, কলেজ অব ক্রিশ্চিয়ান থিওলজি বাংলাদেশের উপাচার্য রেভারেন্ড পলাশ রায়, গৌরনদী উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব শরীফ জহির সাজ্জাদ হান্নান, আগৈলঝাড়া উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব বশির আহমেদ (পান্না), ধর্মীয় নেতা মাওলানা আসাদুজ্জামান, যতীন্দ্রনাথ মিস্ত্রী ও ফাদার মাইকেল দেউরি। মুসলিম, হিন্দু ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা এই সংলাপে অংশ নিয়ে পারস্পরিক সহাবস্থান ও সম্প্রীতি বিষয়ে মতবিনিময় করেন।

সংলাপ শেষে মার্কিন রাষ্ট্রদূত দুপুরে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের গৌরনদী উপজেলার সরিকল এলাকার বাসভবনে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন।

উল্লেখ্য, মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন রবিবার সকালে লঞ্চে করে দুই দিনের সফরে বরিশালে পৌঁছান। সফরকালে তিনি স্ত্রী ডিয়ান ডাও-কে সঙ্গে নিয়ে ঝালকাঠির ভীমরুলির ভাসমান পেয়ারা বাজার ও পেয়ারাবাগান পরিদর্শন করেন। এছাড়া তিনি সদর উপজেলার কড়াপুরের ঐতিহাসিক মিয়াবাড়ি মসজিদ পরিদর্শন করেন এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর আমন্ত্রণে কীর্তনখোলা নদীতে নৌবিহারে অংশ নেন।