তীব্র তাপদাহ এবং দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিংয়ের কারণে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে কুষ্টিয়ার জনজীবন। শহরাঞ্চলে বিদ্যুতের ঘাটতি কিছুটা সামাল দেওয়া গেলেও গ্রামীণ এলাকার পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক। জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে। লোডশেডিংয়ের এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ দৈনন্দিন জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে।

বোরো ধান আবাদের এই গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমে সেচ কার্যক্রম নিয়ে মারাত্মক সংকটে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সেচ পাম্প বা গভীর নলকূপ সচল রাখা সম্ভব হচ্ছে না, ফলে ফসলি খেত শুকিয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে ডিজেলসংকট। কুষ্টিয়া সদর উপজেলার কৃষক মেহেদী জানান, "সময়মতো সেচ দিতে না পারায় খেতের ফসল রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে।"

বিদ্যুৎ বিভ্রাটের প্রভাবে পোলট্রি খামার ও স্থানীয় ক্ষুদ্র শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদনও ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলা সদরের পৌর এলাকাগুলোতেও লোডশেডিংয়ের মাত্রা বেড়েছে; দিনভর প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকছেন শহরবাসী। তবে মিরপুর, ভেড়ামারা, দৌলতপুর ও কুমারখালী উপজেলায় পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ।

কুমারখালী উপজেলার চাঁদপুর গ্রামের বাসিন্দা নিজাম জানান, দিনের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ঘরে অবস্থান করা একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়েছে। খোকসা উপজেলার গোপগ্রামের বাসিন্দা সাইফুল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "বিদ্যুৎ কখন আসবে বা কখন যাবে, তার কোনো নিয়ম নেই। তীব্র গরমের মধ্যে শিশু আর বৃদ্ধদের নিয়ে আমরা চরম দিশেহারা।"

আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে জেলার তাপমাত্রা ৩৪ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে। এই তপ্ত আবহাওয়া ও বিদ্যুৎহীনতার কারণে জেলাজুড়ে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় মোটর চালনা করা যাচ্ছে না, ফলে পানির পাম্পগুলো অচল হয়ে পড়েছে। পৌর এলাকার গৃহবধূ নিতু বলেন, "বিরামহীন লোডশেডিংয়ের সাথে যোগ হয়েছে পানির হাহাকার। ঘরে এক ফোঁটা খাবার পানি নেই। তীব্র গরমে জীবন ওষ্ঠাগত, তার ওপর পাম্প বন্ধ থাকায় দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করেছে।"

লোডশেডিংয়ের কারণ হিসেবে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো) কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হঠাৎ তাপদাহ বাড়ায় বিদ্যুতের চাহিদা অত্যধিক বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে, যা সামাল দিতে গিয়ে বাধ্য হয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ রাখতে হচ্ছে।

একই ব্যাখ্যা দিয়েছেন কুষ্টিয়া পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের ডিজিএম আরিফুল ইসলাম। চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকায় আমরা বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিচ্ছি। প্রচণ্ড গরমে গ্রিড উপকেন্দ্রগুলো অতিরিক্ত চাপে পড়েছে। আমরা এলাকাভিত্তিক সুষম বণ্টন বজায় রাখার চেষ্টা করছি। তবে জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ বৃদ্ধি না পেলে এই সংকটের চূড়ান্ত সমাধান সম্ভব নয়।"