ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীদের রক্তে অণুচক্রিকা বা প্লেটলেটের মাত্রা কমে গেলে তা বাড়াতে পেঁপেপাতার রস খাওয়ানোর একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে। তবে এই বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ধানমন্ডির পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিসিন-বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. সাইফ হোসেন খান এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। রাফিয়া আলমের সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি সাজানো হয়েছে।

সাধারণত প্লেটলেটের মাত্রা কমে গেলে রোগী ও তাদের স্বজনরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ডা. সাইফ হোসেন খান জানান, প্লেটলেট কমলে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি থাকে ঠিকই, তবে কেবল প্লেটলেটের মাত্রা দিয়ে রোগের তীব্রতা বা রক্তক্ষরণের ঝুঁকি পুরোপুরি নির্ধারণ করা যায় না। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে প্লেটলেট কমার চেয়েও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হলো প্লাজমা লিকেজ, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ এবং শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি হওয়া।

প্লাজমা লিকেজ বলতে রক্তনালি থেকে রক্তের তরল অংশ বের হয়ে যাওয়াকে বোঝায়। এর ফলে ফুসফুসের চারপাশে বা পেটে তরল জমতে পারে, রক্তচাপ কমে যেতে পারে এবং হৃৎস্পন্দনের গতি বেড়ে যাওয়ার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।

পেঁপেপাতার রসের কার্যকারিতা নিয়ে সীমিত কিছু গবেষণায় প্লেটলেট বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও, রস প্রস্তুত প্রণালি ও মাত্রার ভিন্নতার কারণে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। এছাড়া এই রস সেবনে ডেঙ্গুর গুরুতর জটিলতা বা মৃত্যুঝুঁকি কমেছে বলে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ডেঙ্গু জ্বরের রিকভারি ফেজে সাধারণত প্লেটলেট স্বাভাবিকভাবেই বাড়তে শুরু করে, তাই এই বৃদ্ধি পেঁপেপাতার রসের কারণে হয়েছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।

বিশেষজ্ঞের মতে, ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে চিকিৎসকের পরামর্শ বা প্রয়োজনীয় ফলোআপ এড়িয়ে যাওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এতে গুরুতর জটিলতা শনাক্ত করতে দেরি হতে পারে। এছাড়া পেঁপেপাতার রস মানবদেহের জন্য কতটা নিরাপদ সে বিষয়ে পর্যাপ্ত উচ্চমানের গবেষণা নেই; প্রাণীদের ওপর করা কিছু গবেষণায় লিভারের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা দেখা গেছে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত পেঁপেপাতার রস গ্রহণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে কেবল সিবিসি পরীক্ষার প্লেটলেট মাত্রার ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। একজন চিকিৎসক রোগীর রক্তচাপ, হৃৎস্পন্দন, শ্বাসপ্রশ্বাস, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং সিবিসি-র হেমাটোক্রিট ও শ্বেতকণিকার মতো বিভিন্ন প্যারামিটারের ভিত্তিতে রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করেন।

জ্বর বা ব্যথার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল খাওয়া যেতে পারে। তবে অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেনসহ এনএসএআইডি (নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগ) জাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়, যা ডেঙ্গু রোগীর জন্য বিপজ্জনক।

তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তবমি, কালো পায়খানা, নাক বা মাড়ি থেকে রক্তপাত, মাসিকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, অস্থিরতা, শ্বাসকষ্ট, প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া, ত্বক ঠান্ডা বা ফ্যাকাশে হওয়া, অস্বাভাবিক ঘুমভাব বা আচরণের পরিবর্তন দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, জ্বর কমে গেলেই রোগী বিপদমুক্ত নন; অনেক ক্ষেত্রে জ্বর কমার পর জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

সবশেষে জানানো হয়েছে, কেবল প্লেটলেট কমেছে বলে নিয়মিত প্লেটলেট পরিসঞ্চালনের প্রয়োজন হয় না। রোগীর রক্তক্ষরণ ও সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে চিকিৎসক এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।