মাটি ও মানুষের জীবনচিত্রকে তুলির আঁচড়ে বিশ্বদরবারে পরিচিত করে তোলা প্রখ্যাত চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী আজ ১০ আগস্ট। এই বিশেষ দিনটি উপলক্ষে তার জন্মভূমি নড়াইলে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ বছর বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ও শিল্পশিক্ষাবিদ ড. মো. আব্দুস সাত্তারকে ‘সুলতান সম্মাননা পদক-২০২৬’ প্রদান করা হবে।

in ১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নড়াইল মহকুমার মাছিমদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শেখ মোহাম্মদ সুলতান, যিনি বিশ্বজুড়ে এস এম সুলতান নামে পরিচিত। তার বাবা মেছের আলী এবং মা মাজু বিবি। শৈশব থেকেই ছবি আঁকার প্রতি প্রবল আগ্রহী এই শিল্পী পরবর্তীতে নিজস্ব অনন্য শৈলীতে বাংলার কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ ও গ্রামীণ প্রকৃতিকে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলেন, যা তাকে দেশের চারুশিল্পের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অবস্থানে বসিয়েছে।

সুলতানের কালজয়ী শিল্পকর্মগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— ‘পাট কাটা’, ‘ধান কাটা’, ‘ধান ঝাড়া’, ‘ধান মাড়াই’, ‘ধান ভানা’, ‘চর দখল’, ‘জমি কর্ষণে যাত্রা’, ‘মাছ ধরা’, ‘নদীর ঘাটে’, ‘গুন টানা’, ‘ফসল কাটার ক্ষণে’, ‘শরতের গ্রামীণ জীবন’ ও ‘শাপলা তোলা’। তার প্রতিটি চিত্রে ফুটে উঠেছে কর্মজীবী মানুষের শারীরিক শক্তি, জীবনসংগ্রাম এবং বাংলার মাটির সঙ্গে মানুষের নিবিড় আত্মিক সম্পর্ক।

শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের জন্য তিনি ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্ট আর্টিস্ট স্বীকৃতি, ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন। এছাড়া দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকেও তিনি একাধিক সম্মাননা লাভ করেন।

১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন এই প্রথিতযশা শিল্পী। পরবর্তীতে নড়াইল শহরের কুড়িগ্রাম এলাকায় এস এম সুলতান সংগ্রহশালা চত্বরে তাকে পূর্ণ মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।

জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সোমবার সকালে এস এম সুলতান শিশু স্বর্গে কোরআনখানি, সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন, আর্ট ক্যাম্প, শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

এস এম সুলতান সংগ্রহশালার কিউরেটর তন্দ্রা মুখার্জী জানান, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে এবং চারুকলা বিভাগের ব্যবস্থাপনায় এবারের জন্মবার্ষিকী উদযাপিত হচ্ছে। পুরো আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতা করছে এস এম সুলতান সংগ্রহশালা, জেলা শিল্পকলা একাডেমি ও নড়াইল জেলা প্রশাসন।

তিনি আরও জানান, শিল্পীর স্মৃতি ও অবদানের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রতিবছর গুণী শিল্পীদের ‘সুলতান সম্মাননা পদক’ দেওয়া হয়। এ বছর এই সম্মাননার জন্য মনোনীত হয়েছেন চিত্রশিল্পী ড. মো. আব্দুস সাত্তার। জন্মবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী তার হাতে এই পদক তুলে দেবেন।

উল্লেখ্য, পদকপ্রাপ্ত ড. আব্দুস সাত্তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগে দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেছেন। প্রাচ্য শিল্পরীতি, ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় ও প্রাচ্য ম্যুরাল এবং আধুনিক শিল্পভাবনার সমন্বয়ে শিল্পকর্ম সৃষ্টিতে তার বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। শিল্পকলায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একুশে পদক-২০২৬ লাভ করেন। তার ২০টিরও বেশি গবেষণা ও শিল্পবিষয়ক প্রকাশনা রয়েছে, যার বেশ কিছু কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স বই হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল ছালামের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই স্মারক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চু এবং নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম।