বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হোসেন জিল্লুর রহমান বলেছেন, ‘বড় সংস্কার’-এর পাশাপাশি ‘ছোট সংস্কার’-এর দিকে নজর না দিলে বড় সংস্কার কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা থাকে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রশাসন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রব্যবস্থার কিছু প্রবণতা, সংস্কৃতি ও ক্ষমতার ধরন এখনো বিদ্যমান। এসব পরিবর্তনে তিনি ছোট ছোট প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রক্রিয়াগত সংস্কারের ওপর জোর দেন। সংবিধান, রাষ্ট্রকাঠামো বা আইন বিভাগের বড় সংস্কার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই অসংখ্য ছোট ও প্রক্রিয়াগত সংস্কারও প্রয়োজন—এমন মত দেন হোসেন জিল্লুর রহমান।
আজ শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে অনলাইনে পিপিআরসি আয়োজিত ‘অভ্যুত্থান–উত্তর বাংলাদেশে তারুণ্যের বহুমুখী সম্ভাবনা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন হোসেন জিল্লুর রহমান।
বাংলাদেশে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাই সবচেয়ে বড় শক্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে হলে শুধু রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সংস্কার করলেই হবে না। মাঠপর্যায়, কমিউনিটি ও রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক পরিসরেও একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজন আছে।
শিক্ষার প্রসঙ্গে সাবেক এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা বলেন, শুধু একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করলেই শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন হবে না। শিক্ষক নিয়োগ কীভাবে হচ্ছে এবং শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে পরিবেশ কীভাবে তৈরি করা হচ্ছে—এসব বিষয়েও সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন আনতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
স্বাস্থ্য খাতেও একইভাবে ছোট ছোট পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে কীভাবে স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি শক্তিশালী স্তম্ভ করা যায়, সেদিকে নজর দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে পরিবর্তনের জন্য তরুণেরা বিভিন্নভাবে সক্রিয় আছেন। তবে কাঙ্ক্ষিত ‘সিস্টেম চেঞ্জ’ আনতে হলে শুধু তরুণদের শক্তি যথেষ্ট নয়; পরিবর্তনের বিপরীত শক্তিগুলোও শক্তিশালী। তাই বিভিন্ন পর্যায়ের সম্মিলিত শক্তির সঙ্গে তরুণদের একটি ইতিবাচক বন্ধন তৈরি করা প্রয়োজন।
হোসেন জিল্লুর রহমানের মতে, পরিবর্তনের প্রক্রিয়াকে শুধু ঢাকা বা ‘এলিট পরিসরের’ মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। এর জন্য বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। তিনি বলেন, প্রযুক্তির ব্যবহার, রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরি কিংবা বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন—সব ক্ষেত্রেই বিকেন্দ্রীকরণ দরকার। দেশের প্রতিটি এলাকার মানুষকে পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে দেখার কথাও জানান তিনি।
কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নয়, ব্যক্তির আচরণেও পরিবর্তন আনার প্রয়োজন রয়েছে—এমন মন্তব্য করেন হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, ‘পরিবর্তনের শেষ বিচারে প্রশ্ন হলো—আমরা নিজেরা পরিবর্তিত হচ্ছি কি না এবং আমাদের আচরণ ও মূল্যবোধের উন্নয়ন হচ্ছে কি না।’
জুলাইয়ের আন্দোলনে যে আকাঙ্ক্ষা উচ্চারিত হয়েছিল, সেই আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশকে মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক এবং মেধার বিকাশের উপযোগী দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে বলে উল্লেখ করেন সাবেক এই উপদেষ্টা।
প্যানেল আলোচনায় অলটারনেটিভসের ন্যাশনাল অর্গানাইজিং কমিটির সংগঠক তাজনূভা জাবীন বলেন, অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাষ্ট্র ও রাজনীতি পুনর্গঠনে ডাক্তার, প্রকৌশলী, ব্যাংকারসহ বিভিন্ন পেশার তরুণদের যুক্ত হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে নারীদের রাজনীতিতে আসার সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
প্যানেল আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম এম খালিকুজ্জামান, বেঙ্গল ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্টের সহপ্রতিষ্ঠাতা মুনীম মোবাশ্বের, কৃষি উদ্যোক্তা ও কনটেন্ট নির্মাতা উম্মে কুলসুম পপি, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিশুদের শিক্ষা নিয়ে কাজ করা শিক্ষার্থী ডাও সিং নু মারমা, কৃষিপণ্য সরবরাহভিত্তিক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ফসল ডটকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সাকিব হোসাইন।