বাংলাদেশে নির্বাচনের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে ভারতের সরকারি মহলের পক্ষ থেকে ইতিবাচক বার্তা আসলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। এমনকি নির্বাচনের সময় গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিবিদদের মাঝেও এমন ইঙ্গিত ছিল, তবে বর্তমানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভারতের ভেতরে এক ধরনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করছে বলে মনে হয়।
পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে যে, ইতিবাচক পথে এগোনোর প্রক্রিয়াটি বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়েছে এবং ভারত এখন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের ধারায় চলে গেছে। অন্যদিকে, ফেব্রুয়ারি মাসে নির্বাচনের পর থেকেই বাংলাদেশ সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। নির্বাচনের পরপরই ভারতীয় নাগরিকদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া অবারিত করে দেয় ঢাকা। তবে ভারত এর বিপরীতে বাংলাদেশের নাগরিকদের ভিসার বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়নি। ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী জুনে ঢাকায় পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য পুরোদমে ভিসা চালু করেনি দিল্লি।
সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত একটি নির্দিষ্ট স্ট্র্যাটেজিক ট্র্যাজেক্টরি বা কৌশলগত গতিপথ অনুসরণ করছে এবং সেখান থেকে সরতে চাইছে না। বিশেষ করে নির্বাচনের পর সম্পর্কের নবযাত্রার কথা বলা হলেও, বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতাকে আত্মস্থ করতে ভারত আগ্রহী বলে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে না। ফলে গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর সম্পর্কে প্রত্যাশিত গতি আসেনি।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়া হয়ে চীনে গেলে ভারতে বিভিন্ন মহলে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের পক্ষ থেকে এমন বার্তা এসেছে যে, বাংলাদেশ প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে আগ্রহী নয়। এই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ করে দিয়ে ভারত কোনো বিশেষ বার্তা দিতে চাইছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে সম্পর্ক উন্নত হবে—ভারতের বিভিন্ন স্তরে দেওয়া এই আশ্বাসের বাস্তব প্রতিফলন নেই। গত ছয় মাসে দুই দেশের মধ্যে আস্থার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এছাড়া ভারতের নতুন হাইকমিশনার বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পৌঁছানোর পর যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা থেকে মনে হচ্ছে ঢাকার বিষয়ে দিল্লির বার্তা যথাযথভাবে আসছে না এবং ভারত পরিবর্তিত বাংলাদেশকে বুঝতে পারছে না।
এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব ও আস্থার ঘাটতির মধ্যেই গত বুধবার দিল্লিতে শেখ হাসিনা গণমাধ্যমে মতবিনিময় করেন। এই ঘটনা বাংলাদেশের সরকার ও রাজনৈতিক মহলের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ এবং সাধারণ জনগণের মাঝে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক এখন নতুন এক জটিলতার মুখে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। ভারত যদি বাংলাদেশকে সম্মান করে এবং বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটেছে তা মেনে নেয়, তবেই সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া সমীচীন হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে সম্পর্কের ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাই স্পর্শকাতরতা এড়িয়ে অভিন্ন স্বার্থের প্রতি মনোযোগ দেওয়া এখন বাঞ্ছনীয়।
— এম হুমায়ুন কবির: সাবেক রাষ্ট্রদূত এবং বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) প্রেসিডেন্ট।