রবীন্দ্রনাথের শিল্পকর্মে মেলে সৃষ্টির কোমল-কঠিন রূপ, আত্মানুসন্ধান, সুসমাজভাবনা, মানবপ্রেম ও আকাঙ্ক্ষার সুখ–দুঃখের টান। তাঁর লেখায় দ্রোহ-আন্দোলনের প্রতিধ্বনি, মাটির গন্ধের সহজ স্মৃতি, আর সর্বোপরি সভ্যতা-মানবতার বিচিত্র নির্যাস। অনন্তলোকযাত্রার তিথি উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথের প্রতি নিঃশীম শ্রদ্ধার নৈবেদ্য জানাতে চাইলে কেবল গানের ফুল সাজিয়ে থেমে যাওয়ার নয়—গানকে ঘিরে থাকে আরও বেশি উপলব্ধি।

আজিমপুর কলোনির ৩/ই। সন্‌জীদার সরকারি কোয়ার্টার্সে নিত্যদিনের মতো উপস্থিত ওয়াহিদুল আর তাদের তিন সন্তান। সময়-অসময়ের ক্ষণিকের অতিথি হিসেবে বহু মানুষের আনাগোনা—সত্যেন সেন, শহীদ সাবের, লোকমান হাকিম, সাইফউদ্দিন মানিক, দেওয়ান ইদ্রিস...অগুনতি—থাকলেও প্রতিদিনের তালটাই বদলায় না। প্রতিটি সকাল শুরু হয় স্টেরিওগ্রামে রাগ-রাগিণীর কালোয়াতি দিয়ে, অথবা মনকাড়া মিঠে গানের অনুরণন দিয়ে। এরপর হারমোনিয়ামে ওয়াহিদুলের সুরসাধনার চর্চা। অসুরকে তাড়ানোর মতো আপ্রাণ চেষ্টা—এই চেতনায়ই গানের ভেতর দিয়ে তারা টানতে থাকেন আপন ধারার আলো। গাঁয়ের শ্যামলিমা, রোদ-ঝড়-বৃষ্টির ছোঁয়া, চাঁদ-সুরুজের আলোছায়ায় বেড়ে ওঠা সাংবাদিকের তো আর সুরের প্রথাসিদ্ধ পাঠ নেই!

নবীন যুগল তখন হাবুডুবু খাচ্ছে রবিসায়রে। ছেঁকে ধরছে সমাজভাবনা, শিক্ষাদর্শন, সাহিত্য, গান, নৃত্যনাট্য, গীতিনাট্য, গীতি–আলেখ্য, চিত্রকর্ম—আর সেই সঙ্গে নিজের লেখা মেরামতের কাটাকুটির কারুকাজ। তবে সবচেয়ে গভীর টানটি কোথায়? তারা যে প্রেমের আসল মূলে পৌঁছাতে পারে, সেটা সংগীত।

সন্‌জীদা কৈশোরোত্তীর্ণ হওয়ার পরেই তৈরি, আর ওয়াহিদুলের গৃহপ্রবেশ রবিসুধায়। গুরু-শিষ্যের ধারাটি যেন ঘরের ভেতরই প্রবাহিত। সাংবাদিকের অফিস বিকেলে হলেও দিন কাটে মূলত বাসাতেই—গানকে কেন্দ্র করে। সন্‌জীদা কলেজশিক্ষক; ঘরে ফিরলেই হাতে পান হারমোনিয়াম। কিন্তু ঘর-সংসার আর ছেলেপুলের দেখাশোনার কারণে গাইবার অবকাশ সীমিত। তবু কোনো অনুষ্ঠান পেলে অবলীলায় সব কাজ বাদ দিয়ে গানেই ধ্যান—নিষ্ঠার এই দৃষ্টিভঙ্গি তাদের মধ্যে স্পষ্ট। গানকে অবহেলা করার প্রবণতা নেই। ধাতে নেই।

বছর ঘুরতে না ঘুরতেই জুটির নতুন ব্যস্ততা—ছায়ানট। দুজনেরই ধনুকভাঙা পণ, বাঙালিকে আপন সংস্কৃতি নিয়ে চলবার সাহস জোগানো। মানুষের সান্নিধ্যে পৌঁছাতে নানা আয়োজন নিয়ে ছোটেন ওয়াহিদুলরা। সন্‌জীদার কাজও গান—গানের মানুষ তৈরি, আর অনুষ্ঠান গাঁথা। কদিনের মধ্যেই তাঁদের বোঝাপড়া দৃঢ় হয়, সংগীতই মনে সবচেয়ে বড় দাগকাটা শক্তি। দুজনেই গান নিয়ে পাগলপারা। কেন্দ্রে রবীন্দ্রনাথ। তাঁকে ঘিরে নজরুলের মতো সংগীতসংস্কৃতির অন্যান্য মহামানবও জায়গা পায়। প্রতি সন্ধ্যায় ৩/ই-র ঘর ভরা থাকে সুরে-ছন্দে গমগম করে। গান আর বাঙালির ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-দেশভাবনা নিয়ে আড্ডার টানে শামসুর রাহমান, কামরুল হাসান আসেন। সঙ্গে থাকেন এন্তার উঠতি কবি-সাহিত্যিক, চারু-কারু শিল্পী।

গুরু–শিষ্যের দুই ধারা। ওয়াহিদুল সুর-স্বর কচলিয়ে উচ্চাঙ্গ ঘরানায় রবীন্দ্রগানে রাগরূপ ঢুঁড়ে বেড়ান। আভাস পেলেই রাগরূপের স্বরবিন্যাসে কড়া নজর। দৌরাত্ম্যে মাঝেসাঝে রবিরচনা চলে যেতে পারে—এমন খেয়াল কম হলেও, আবেগতাড়িত রবীন্দ্রনাথ যখন কোনো বাণীর ভাব প্রস্ফুটনে রাগসীমার বাইরের স্বর ছুঁয়ে অভূতপূর্ব ব্যঞ্জনা জাগান, তখন বাণী নিয়েও তাঁদের বাছবিচার বাড়ে; যেন সৃষ্টিবন্দনাই মুখ্য হয়ে ওঠে। যেসব রবীন্দ্রনাথের কাঁচা বয়সের রচনা, সেখানে বৈচিত্র্য থাকলেও যেন এক ছাঁচ—বাণীবোধ প্রখর। তা-ও সুরবিহারই ওয়াহিদুলের বেশি পছন্দ। পূজা-প্রার্থনার গানের ভিতরেও প্রকৃতির ঝিলিক থাকে; খানিক ঘ্যানঘেনে একঘেয়েমির অবসান ঘটে।

তবে আজন্মের প্রেমিকমনে প্রেমের গানের ঠাঁই খুঁজতে গেলে দেখা যায়, গায়নে গুরুত্ব পায় সমান ওজনে স্বরপ্রক্ষেপণের দিকটি। বাণীর মেজাজ ধরতে পারলে আবেগস্নাত প্রবল বা কোমল ওজনে প্রকাশ উঠে আসাও সহজ হয় না—এমনভাবেও দেখা যায় তাঁদের কাজের ভঙ্গি। তবু অনস্বীকার্য, রবীন্দ্রসুরের চলন যখন বাণীর সঙ্গে মিলিয়ে দেয় সমাজ-মানবতা-প্রকৃতি, আর বাঙালি সত্তা ও চেতনার বোধ—তখন তা চোখ খুলে দেয় অজুতজনের। দেশের নানা প্রান্ত ঘুরে তাঁরা হয়ে উঠেছেন অতুলনীয় এক সংগীতজ্ঞ। রবীন্দ্রগান ফেরি করে জাতিসত্তা গড়ে তোলার যে অনবদ্য গুণীতা, তা তাঁদের পরিচয়ের বড় অংশ।

ওয়াহিদুলের পড়ন্ত বেলায়ও দেখা যায় শৈশব থেকেই সন্‌জীদা নানা প্রান্তর চষে বেড়িয়েছেন। মিঠে সুরের গান, আবেগ আর অভিব্যক্তি—সব মিলিয়ে তাঁর মন মজেছিল। ভাষাসাহিত্যের ছাত্রীর সহজ বিশ্লেষণও কেড়েছে নিবিড় মনোযোগ। তাঁর কথায়, গানের কাব্য ফুটে ওঠে স্পর্শ, মিড়, আধ মাত্রা, ঠায় স্বর আর বাণীর সঙ্গে সুরের খেলায়। সুরেলা মূর্ছনায় বাঙালির অন্তরে জায়গা নেয় আত্মোপলব্ধি, মানবতা, মঙ্গলবার্তা—আর গড়ে ওঠে সংস্কৃতিমনন। সামষ্টিক বোধের সূচনা অন্তত সাত দশকের।

সোহরাব হোসেনের কাছে নজরুলগীতি, মুন্সী রইসউদ্দিনের তখতে রাগসংগীত; আলী আহসানের ব্যাখ্যায় রবীন্দ্রসাহিত্যে ঝুঁকে পড়তে পড়তেই হুসনা বানু খানমের কাছে মিলেছে বিশ্বকবির সুরসন্ধান। নজরুলের অসাম্প্রদায়িকতা আর দ্রোহী আঁচের সঙ্গে যুক্ত হলো আধ্যাত্মিকতা-বিশ্বজনীনতার সত্তা। শান্তিনিকেতনে গিয়ে সেই সম্পদ আরও প্রগাঢ় হয়। দেশে ফিরে এসে পূর্ণাঙ্গ ভাবাদর্শের প্রতিফলন, ওয়াহিদুলদের নিয়ে আন্দোলন, ছায়ানট এবং অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায় রবীন্দ্রদর্শন ও নজরুলচেতনা। নগরে হলো বাংলা বর্ষবরণ উদ্‌যাপনের গোড়াপত্তন। আর একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে গান নিয়ে যে উজ্জীবনের লড়াই—তারও অন্যতম প্রেরণা হয়ে ওঠে দুই মহাপুরুষ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষণকাজে রবীন্দ্রসাহিত্যই ছিল সন্‌জীদার প্রধান উপজীব্য। স্বাধীন দেশে গান দিয়ে সংস্কৃতিকে মানুষের কাছে নিয়ে গেছেন ছায়ানট আর সম্মিলন পরিষদের হাত ধরে। এর মধ্যে ছেদ পড়েনি। অতিমারী করোনার সময়ে তাঁরা ছিলেন অনলাইন। শরীর যখন মানে না, তখনও ঘরে বসেই রবীন্দ্রবাণী আর সুরে উদ্ভাসিত করে গেছেন পিয়াসীদের।

পরম আন্তরিকতায় দুই রবীন্দ্রপ্রেমী নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করেছেন—শুনে, পড়ে, করে, আলাপে। আত্মোন্নয়নের চর্চাও ছিল ধারাবাহিক। আজীবন ছড়িয়ে গেছেন সেই বোধ; গানে বাণী ফুটিয়ে তুলতে জুতসই সুর প্রয়োগের অতুল জাদুকর রবিবাবু; পরিণত বয়সেও অনুপম। অনুসারীরা আরও জেনেছে—প্রকৃতি বা মানব প্রতিবেশের ছোঁয়ায় হঠাৎ রবীন্দ্রনাথের মনে কোনো সুর গুনগুনিয়ে ওঠে; ব্যস, তার জুড়ি বাণীরও স্বতঃস্ফূর্ত উৎসারণ। উল্টোটাও ঘটে—কবিতা থেকে গান, আবার সে গান থেকে ফিরে কবিতা। মনের ভাবে স্বভাবকবির কত্ত খেলা! কখনো দুম করে গানের কিছু বাণী পাল্টে ছন্দ দিলেন—আর সেই আবেগের খেলাটিই সন্‌জীদা বলেছেন, ‘রূপে রূপে অপরূপ’।

এই ধরনের গানের মধ্যে আছে—‘আমার নয়ন তোমার নয়নতলে’; ‘আমার নয়ন তব নয়নের নিবিড় ছায়ায়’; ‘বসন্তে বসন্তে তোমার কবিরে দাও ডাক’; ‘খাঁচার পাখি ছিল সোনার খাঁচাটিতে’।

গাওয়া আর গীতবিতানের গানের বাণী আলাদা—এ বিষয়টিও তাঁরা মনে করিয়ে দেন। দুই ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ; সুরকারের খেলা, গীতিকারের অভিরুচি। যেমন ‘বারতা পেয়েছি মনে মনে’। আবার কোনো সুর ছেঁকে ধরলেই বাণী বসিয়ে গান বেঁধে ফেলেছেন তিনি। বাউল-ভিন ভাষা-ভিন দেশের গান যা-ই হোক। তিনি প্রাণের জাতীয় সংগীতের সুর নিয়েছেন বাউল গগন হরকরার ‘আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে’ গান থেকে। বিশ্বকবির ব্যাপক ঋণ উত্তর ভারতীয় ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পার কাছে। কিছু প্রচলিত গান; ধ্রুপদাঙ্গের ‘দাঁড়াও, মন, অনন্ত ব্রহ্মাণ্ড-মাঝে’, খেয়ালাঙ্গের ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’, টপ্পাঙ্গের ‘খেলার সাথী বিদায় দ্বার খোলো’। আর স্কটিশ সুরে কথা বসিয়ে করেছেন ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’।

সন্‌জীদা আর ওয়াহিদুলের গায়নে প্রধান অমিল দুজায়গায়। এক, ওয়াহিদুল খটাখট স্টাকাটো নোট লাগান, কাঠখোট্টা শোনালেও চোখা স্বর লাগানোর পক্ষে। সন্‌জীদা কিছুতেই সরাসরি যাবেন না। যুক্তি তুলে ধরা হলো—দূরের স্বরে সরাসরিই সুর লাগবে তবে আওয়াজ হবে কোমল থেকে স্বাভাবিক। আমতা আমতা করে মেনে নেন সন্‌জীদা। খণ্ডন না করলেও বিশেষ আমল দেননি ওয়াহিদুল। অন্য বিষয়টি দমের। সুরের চলনে মনোযোগী ওয়াহিদুল মোটামুটি বেদম হওয়ার আগে পর্যন্ত গেয়ে চলতেন। বাণীর অর্থ ফোটাতে সন্‌জীদা দমের ফুরসত খুঁজে বেড়ান। এমনও হতো, একটা শব্দই অপূর্ব দ্যোতনা জাগায়। বলতেন, গানের প্রতি বাক্যের মধ্যেও বাক্যাংশ চিনে নিতে হয়। ফুটে ওঠে অদৃশ্য যতিচিহ্ন, শ্রোতাকে মোহাবিষ্ট করার অর্থপূর্ণতা পায় বাণী। তাঁর উদাহরণে আসে দমের সুবিধার জন্য একই শব্দ ভেঙে ফেলার বিভ্রাট বোঝানোর কথা—‘সুন্দর হৃদিরঞ্জন তুমি নন্দনফুলহার’ গানের। অনেকে গেয়ে ফেলেন, ‘সুন্দর হৃদি’ দম নিয়ে ‘রঞ্জন তুমি’ পরের দমে ‘নন্দন’ আবার দম নিয়ে ‘ফুলহার’। হবে ‘সুন্দর হৃদিরঞ্জন’, ‘তুমি’, ‘নন্দনফুলহার’।

দুজনের জীবনদর্শনে বেশ অমিল গজালেও গান গাওয়ায় মিলই বেশি। একাগ্র সাধনায় মান্য করেছেন স্বরবিতান। মর্জিমাফিক পাল্টে ফেলেননি, অজুহাত দেননি—‘অমুকের কাছে তো এমনই তো শিখেছি!’ রবীন্দ্রনাথের গেয়ে ওঠা গানের সুর লিপিবদ্ধ করেছেন মূলত দীনু ঠাকুর, শৈলজারঞ্জন, ইন্দিরা দেবী, কাঙ্গালীচরণ সেন; সকলেই উচ্চমার্গের। ওয়াহিদুল-সন্‌জীদা একমত, পণ্ডিতদের অবজ্ঞা নয়। বিশেষত প্রথাগত পাঠদানে বছরের শুরু আর শেষে একই সুর, চলন, বোধন, গায়ন না হলে শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্ত হয়। অথচ সর্বজনবিদিত, স্বরলিপি নিষ্প্রাণ নির্দেশিকামাত্র; তাতে আবেগ ঢেলে প্রাণবন্ত করে তোলার দায়িত্ব গায়কের। গায়কভেদে নানা অভিব্যক্তি। একেক কাল-সময়-পারিপার্শ্বিকে একই গায়কের স্বাদযোগও একেক। তবু তো জীবন্ত!

তর্কাতীতভাবে দুজনই প্রাজ্ঞ, দুজনেই গুণী। মতভেদ আছে। তবে এই স্বীকারোক্তিতে ভেদ নেই—সন্‌জীদা খাতুন এবং ওয়াহিদুল হক একই সঙ্গে গুরু ও শিল্পসৃষ্টির নিরুপম কারিগর। রবীন্দ্রনাথের হাতে হাত রেখে বাঙালির সংস্কৃতি-মনন সৃষ্টিতে অপ্রতিম।

  • পার্থ তানভীর নভেদ্: সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মী