পর্দায় সিনেমা চলছিল। ওই সময় খলচরিত্রের অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামানের অভিনয় দেখে রাগে–ক্ষোভে এক দর্শক পর্দায় জুতা ছুড়ে দেওয়ার কথা স্মরণ করলেন অনেকে। দর্শকদের সঙ্গে দেখা হলে কারও কারও মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও নাকি আছে। অভিনেতার প্রতি ভক্তদের অভিজ্ঞতা—‘আপনি ভালো মানুষ না’, ‘আপনি সংসারে অশান্তি বাধান’, ‘আপনি ঝামেলাবাজ’—এ ধরনের কথাও সরাসরিভাবে শোনা গেছে। এই শক্তিমান অভিনেতার অভিনয়ই নাকি দর্শকের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে দেয়, এমনটাই বলছেন আয়োজনে অংশ নেওয়া ও দর্শক-আলোচনায় উপস্থিতরা।

বহুদিন পর সেই স্মৃতিগুলো আবারও নতুন করে মনে করিয়ে দিল ভালো অভিনয়ের আলোচনায়। গত সপ্তাহে শিল্পকলা একাডেমিতে উন্মুক্ত প্রদর্শনী হয় ‘দেলুপি’ সিনেমার। সিনেমা সবে শেষ হয়েছে। মন্দ এক চেয়ারম্যান সাধু সেজে বাঁধের জন্য এলাকার মানুষের কাছ থেকে টাকা তুলছেন—এমনই গল্প দিয়ে শেষ হয় সিনেমা; তবে রেশ তখনও রয়েই যায়। প্রদর্শনী শেষে দর্শকের করতালির প্রতিধ্বনি চলছিল। এরপর সিনেমার কলাকুশলীদের মঞ্চে ডেকে নেওয়া হয়।

পর্দায় দেখা চরিত্রগুলো সামনে দেখে কৌতূহল বেড়ে যায় দর্শকদের। কথা বলার জন্য মাইক্রোফোন এগিয়ে দেওয়া হয়। মাইক্রোফোন যায় ‘দেলুপি’ সিনেমার জাকির চেয়ারম্যানের কাছে। তখনই দর্শক সারি থেকে একজন বলে ওঠেন, ‘আপনি একটা ভণ্ড চেয়ারম্যান।’ কেউ বললেন, ‘ফ্রড’। মুহূর্তের মধ্যেই হাসির রোল পড়ে যায়। নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয়ের স্বস্তির কথাই দর্শকদের আশ্বস্ত করেন এ অভিনেতা। তিনি বলেন, চরিত্রটি ফুটিয়ে তোলাই তাঁর চেষ্টা, আর এটি তাঁর পছন্দের চরিত্র।

শুধু জাকির চেয়ারম্যান নয়—‘দেলুপি’ সিনেমার সবাই যেন চারপাশের চরিত্র হয়ে উঠেছিলেন, এমনটাই বোঝা যায় আলোচনায়। নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করা নূপুরের কথাও বাদ গেল না। মঞ্চে শিল্পীরা কথা বলার সময় দর্শক সারি থেকে বেশ কয়েকজন চিৎকার দিয়ে বললেন, ‘নূপুর কোথায়, নূপুরের কথা শুনতে চাই।’ পরিচালক মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম জানিয়ে দেন, তাঁর বাড়ি খুলনায়; সেখান থেকে প্রদর্শনীতে আসতে পারেননি।

বাংলা সিনেমায় এভাবে চরিত্র হয়ে ওঠার বিষয়টি এখন আর সব সময় চোখে পড়ে না—এ আলোচনাও উঠে আসে। একজন চরিত্র তৈরি করে তোলার প্রক্রিয়ায় বিশাল পার্থক্য তৈরি করে বলেও মত দেন আলোচকরা। তাঁদের ভাষ্য, ‘দেলুপি’ সিনেমার পরিচালক মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম ছোট ছোট চরিত্রগুলোকে প্রাণবন্ত করে তুলতে পেরেছেন। তবু বিভিন্ন সিনেমায় পার্শ্বচরিত্রের অভিনয়শিল্পী, কখনো মূল চরিত্রের অভিনয়শিল্পী হলেও প্রশংসা পেলেও দিন শেষে তাঁরা তেমনভাবে পর্দায় দেখা যায় না—এ প্রসঙ্গটিও আলোচনায় আসে। সময়ের সঙ্গে চরিত্রের অভিনয়শিল্পীরা কেন হারিয়ে যাচ্ছেন—সেই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে।

মোহাম্মদ তাওকীর ইসলামের উদাহরণ টেনে আলোচনায় আসে তাঁর প্রথম ওয়েব সিরিজ ‘শাটিকাপ’। সেখানে ভালো অভিনয় করেছিলেন নতুন এক দল তরুণ—আহসাবুল ইয়ামিন, অমিত রুদ্র, নাজমুস সাকিবসহ আরও অনেকে প্রশংসিত হন বলেও উল্লেখ করা হয়। এরপর সেই তরুণদের মূলধারায় খুব বেশি ডাকা হয়নি বলে বলা যায়—এ কথাও আলোচনায় উঠে আসে। বলা হয় ‘সিনপাট’-এর প্রসঙ্গ। ইলিয়াস কাঞ্চনের সঙ্গে স্মৃতি মনে করালেন আলমগীর।

আরও পেছনে ফিরলে ‘রানওয়ে’ সিনেমার প্রধান চরিত্রের অভিনেতা ফজলুল হক পরবর্তী সময়ে ভালো সুযোগ পাননি—এ রকম কথাও উল্লেখ করা হয়। ‘অনিল বাগচীর একদিন’ সিনেমার মূল চরিত্রের অভিনেতা আরেফ সৈয়দ এখন আর অভিনয় করেন না বলেও উঠে আসে। তিনি এর আগে মুক্তকণ্ঠকে বলেছিলেন, ‘অনেক চেষ্টা করেও অভিনয়ে টিকে থাকতে পারেননি। পরে তিনি দেশের বাইরে চলে যান।’ হুমায়ূন আহমেদের ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ সিনেমার মামুন অনেক দিন ঘুরে সুযোগ পাননি—এ কথাও বলা হয়। পরে এখন তিনি অভিনয় ছেড়ে ব্যবসা করেন।

এছাড়া আলোচনায় আসে—‘আম কাঁঠালের ছুটি’ সিনেমার প্রধান অভিনেতা মো. লিয়ন, ‘প্রিয় মালতি’ সিনেমার শাহজাহান সম্রাট, ‘এশা মার্ডার’ সিনেমার এজাজ আহমেদের মতো বহু অভিনেতা অভিনয়ে প্রশংসা পেলেও তাঁদের নিজেদের টিকিয়ে রাখার প্রশ্নটি রয়ে গেছে। নিজেকে টিকিয়ে রাখার দায় কি একজন অভিনেতার—এ নিয়েও আলোচনা হয়।

কিছু সুযোগবঞ্চিত শিল্পী জানান, তাঁদের নাটকেও ডাকা হয় না। ‘শোভনের স্বাধীনতা’ সিনেমায় অভিনয় করা রুদ্র রাইয়ান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমি সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে প্রশংসা পেয়েছিলাম। পরে ভেবেছিলাম, অভিনয় করব। অনেক ঘুরেছিলাম। সবাই আশ্বাস দেন কাজ দেবে, কিন্তু তেমন কেউই কাজ দেননি। এখন চাকরি নিয়েই আছি। অভিনয় নিয়ে আর খুব বেশি ইচ্ছা নেই।’ কয়েকটি সিনেমা দিয়ে আলোচনায় আসা এক তরুণ চাকরি ছেড়ে নিয়মিত অভিনয় শুরু করেছেন বলেও উল্লেখ করা হয়; তবে একের পর এক ধাক্কা খেতে হচ্ছে। তিনি অভিমানের সুরে নাম প্রকাশ না করে বললেন, ‘কাজের জন্য অনেক ধরনা দিয়েও তেমন সাড়া পাচ্ছেন না। আগামী মাস কীভাবে চলবেন, সেটিও বুঝতে পারছেন না।’

এমন অবস্থায় বৃহস্পতিবার ৬ আগস্ট ৪ জনের মতো নির্মাতার সঙ্গে কথা হয়। কেউ কেউ বলেন, অনেকের সঙ্গে পরিচয় না থাকায় কাজ করা হয়ে ওঠে না। আবার কেউ চেষ্টা করেও অনেক অভিনয়শিল্পীর মুঠোফোন নম্বর পান না—এমন মতও আসে। কেউ কেউ বললেন, শুধু চেনা পরিচয়ের জন্য কাস্টিং করতে হয়। আবার নাটকের মূল চরিত্রগুলো আগেই সহশিল্পী নির্বাচন করে দেন বলেও উল্লেখ করা হয়।

নাট্য পরিচালক রাফাত মজুমদার বলেন, ‘দেখুন, আমি আদনান আল রাজীব ভাইয়ের ‘ইউটিউমার’–এ শরীফ সিরাজের অভিনয় দেখে তাকে কাস্টিং করেছিলাম। বেশ কিছু কাজ হয়েছে। এখন সমস্যা—অনেকেই সিনেমা বা ওটিটি থেকে নাটকে অভিনয় করতে চান না। অনেকের সঙ্গে কমিউনিকেশনের কারণেও কাজ হয় না। এখানে একটা গ্যাপ রয়ে গেছে। তাদেরও এগিয়ে আসতে, শুধু সিনেমায় বা সিরিজে কাজ করব, এমন মনোভাব পরিহার করতে হবে।’

আলোচনায় বলা হয়, পার্শ্বচরিত্র থেকে বহু শিল্পী অভিনয়ের প্রতিভা দেখিয়ে মূলধারায় জায়গা পেয়েছেন। ইন্ডাস্ট্রিও যোগ্যতা অনুযায়ী শিল্পীদের জায়গা করে দিয়েছে—তবু কেউ কেউ নিজেদের এগিয়ে নিলেও অনেকে পিছিয়ে পড়েন।

হলিউডের আলোচিত অভিনয়শিল্পীদের উদাহরণও তোলা হয়। ছোট ছোট চরিত্রে বা ইন্ডি সিনেমায় অভিনয় করে পরবর্তী সময়ে আলোচনায় এসেছেন—আজকের লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিওর কথাও বলা হয়। ‘হোয়াটস ইটিং গিলবার্ট গ্রেইপ’ সিনেমায় মানসিক ভারসাম্যহীন কিশোরের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। ভারতের একটি শর্টফিল্ম দিয়ে আলোচনায় আসেন নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকী। আরও বলা হয় পঙ্কজ ত্রিপাঠী, ভিকি কৌশলসহ অনেকের কথা—তারা কীভাবে জায়গা পেলেন, সে প্রশ্নও আসে।

নওয়াজউদ্দিন এর আগে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন,‘আমি ‘‘সরফোরাজ” সিনেমায় ছোট চরিত্রে অভিনয় করেছি। ‘‘মুন্নাভাই এমবিবিএস’’  সিনেমায় পকেটমার ছিলাম। ভিক্ষুক, দারোয়ান ও মালির মতো ছোটখাটো বহু চরিত্রে কাজ করেছি। একসময় আমার ভবিষৎ কী হবে সেটাও জানতাম না; কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। আমি সব সময় চেষ্টা করে গিয়েছি। আমাকে যেখানেই রাখা হয়েছে, সেখানেই আমি সেই আকার ধারণ করেছি।’

বাংলাদেশে তরুণ শিল্পীরা কীভাবে মূলধারায় নিয়মিত কাজ করতে পারেন—এ নিয়ে পরিচালক শিহাব শাহীন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘একটি আর্ট হাউস বা যেকোনো কাজের চরিত্রে যখন কোনো অভিনেতা প্রশংসা পান, এখন তাঁকে একই ধরনের চরিত্রের বাইরে ভিন্ন চরিত্রেও দক্ষতা অর্জন করতে হবে। দেখা গেল কেউ খুনির চরিত্রে প্রশংসা পেলেন; কিন্তু রোমান্টিক চরিত্রে তিনি অভিনয় করতে পারছেন না। আমি মনে করি সব ধরনের চরিত্রে কাজ করার দক্ষতা অর্জন করা জরুরি। সেই চর্চা থাকতে হবে। নিজেকে তৈরি করতে হবে। সীমাবদ্ধতা থাকা যাবে না।’

এ সময় শিহাব শাহীন আরও বলেন, ‘নিজেদের লুকের যত্ন নিতে হবে। গ্রুমিং করতে হবে; কিন্তু অনেকেই এখানে সেই যত্ন নেয় না। নিজেকে বদলাতে চায় না। আর কমিউনিকেশন বাড়াতে হবে। আমি ভালো করেছি, আমাকে এমনিতেই নেবে সেই মানসিকতা থেকে বের হয়ে অডিশন দেওয়া চর্চা করতে হবে। নিজেকে যোগ্য করে তুলতে হবে। আমাকে ডাকবে এই অপেক্ষায় থাকা যাবে না।’