করোনাকালে বাবাকে হারানোর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে সীমিত দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্র ‘পেইন্ট অন ড্রাই লিফ’ তৈরির উদ্যোগ নেন এর প্রযোজক মাহফুজ নাজিম। পরিচালক ফুয়াদুজ্জামান ফুয়াদ পরিচালিত চলচ্চিত্রটি গত বুধবার দিবাগত রাত ১২টায় চরকিতে মুক্তি পেয়েছে।
চলচ্চিত্রটির প্রযোজক মাহফুজ নাজিম বলেন, ‘নিশ্বাস কত দামি! আমি সেটা অনুধাবন করেছি হাসপাতালের করিডরে দাঁড়িয়ে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে বাবা ১০ দিন লাইফ সাপোর্টে ছিলেন; শেষে আমার চোখের সামনেই চলে গেলেন। একজন মানুষ সামান্য একটু বাতাসের জন্য লড়ছে—এর চেয়ে ভয়ংকর দৃশ্য আমি জীবনে দেখিনি। মৃত্যুকে এত কাছ থেকে সেই প্রথম দেখা।’
তাঁর ভাষ্য, নাম শুনে অনেকের মনে হতে পারে ‘পেইন্ট অন ড্রাই লিফ’ হয়তো কঠিন বা দুর্বোধ্য কোনো গল্প। তবে এটি মূলত নিশ্বাস নিতে পারা না-পারার লড়াইয়ের কথাই তুলে ধরে। প্রযোজক বলেন, ‘“পেইন্ট অন ড্রাই লিফ” আমার কাছে একটা ঋণ শোধের চেষ্টা। বাবাকে যে নিশ্বাসটা এনে দিতে পারিনি, সেটাই তুলে রাখলাম পর্দায়, যেন ছবিটা দেখে বেরিয়ে মানুষ একবার হলেও টের পায়, বুকভরে শ্বাস নিতে পারাটা কত বড় পাওয়া।’
চলচ্চিত্র নির্মাতা ফুয়াদুজ্জামান ফুয়াদের কাছে গল্পটি কেবল একজন মানুষের গণ্ডি পেরিয়ে দেশ, পরিবেশ এবং বৃহত্তর অর্থে পুরো পৃথিবীকেও ছুঁয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘আমি এমন এক শহরে থাকি, যেখানে বাতাসের মান প্রতিদিনের খবরের অংশ। ঢাকায় নিশ্বাস নেওয়া এখন আর স্বাভাবিক ঘটনা নয়, হিসাবের বিষয়। তাই “পেইন্ট অন ড্রাই লিফ”–এর পৃথিবীটা আমার কাছে কল্পবিজ্ঞান নয়, সামান্য এগিয়ে দেওয়া বর্তমান।’
নির্মাণশৈলী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রেও ভিন্নতা আনার কথা জানান তিনি। ফুয়াদ বলেন, ‘আমি ভরসা রেখেছি প্রতিচ্ছবিময় লম্বা স্থির ফ্রেম, কুয়াশাচ্ছন্ন বিমূর্ত দৃশ্যপট আর শব্দের ওপর। সংলাপ এখানে সামান্যই; নিশ্বাসের আওয়াজটাই বেশি জরুরি। দর্শকের হাতে কোনো উত্তর তুলে দিতে চাইনি। শুধু চাই, ছবি শেষ হলে তারা একবার নিজের নিশ্বাসের শব্দটা শুনুক।’
চলচ্চিত্রের তন্বী চরিত্রটি নিজের মায়ের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখেন প্রযোজক মাহফুজ নাজিম। তিনি বলেন, ‘আত্মীয়রা যখন আশা ছেড়ে দিতে বলছিল, মা তখন আরও শক্ত করে বাবাকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। বাবাকে বাঁচাতে গিয়ে তিনিও করোনায় আক্রান্ত হন। কাউকে প্রাণপণে ধরে রাখা, তারপর ধীরে ধীরে ছেড়ে দিতে শেখা—এই গল্পটা পর্দায় আসার আগেই আমি নিজের ঘরে দেখে এসেছি।’
মাহফুজ নাজিম আরও বলেন, ‘তূর্য মুখে অক্সিজেন মাস্ক পরে শুয়ে আছে, আর সেই নল গিয়ে মিশেছে কাচের ভেতর বন্দী একটি ছোট্ট গাছে। বিশ্বাস করেন, সে দৃশ্যে আমি তূর্যকে দেখিনি, দেখেছি আমার বাবাকে। একটু নিশ্বাসের জন্য এক নিঃশব্দ লড়াই!’
চলচ্চিত্রে তন্বী চরিত্রে অভিনয় করেছেন কাজী নওশাবা আহমেদ। তাঁর কাছে কাজটি অভিনয়জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, ‘“পেইন্ট অন ড্রাই লিফ” আমার জীবনে একটা দারুণ উপলব্ধি। আমি যে জীবনটাকে ধীরে ধীরে উপলব্ধি করতে শিখছি, সেই শেখাটাকে আরও একধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে এই কাজটা। আমি মনে করি, “পেইন্ট অন ড্রাই লিফ” প্রকৃতির দেওয়া এক উপহার। আমার আবারও এই ছবিতে অভিনয় করতে ইচ্ছা করে, কবিতার মতো করে নতুনভাবে উপলব্ধি করতে ইচ্ছা করে।’
রাজনীতি নিয়ে আলোচিত সেই সিনেমা, আগস্টে চরকিতে নতুন আরও যা থাকছে—এ রকম প্রেক্ষাপটেও দর্শকদের মধ্যে ‘পেইন্ট অন ড্রাই লিফ’ নতুন আলোচনার জায়গা করে নিচ্ছে। তূর্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইমতিয়াজ বর্ষণ। তাঁর ভাষ্য, ‘একটুখানি শ্বাস নেওয়ার আশায় যে সংগ্রাম, সেই সংগ্রামের কাব্যিক দৃশ্যকাব্য হলো “পেইন্ট অন ড্রাই লিফ”। উন্নয়নের নামে আমরা যেভাবে প্রতিনিয়ত সবুজ ধ্বংস করছি, কোনো একদিন সত্যিই অক্সিজেনের প্রাকৃতিক সরবরাহে তীব্র সংকট দেখা দেবে। তখন কী হবে পৃথিবীর মানুষের? এটি অদূর ভবিষ্যতের সেই শঙ্কার গল্প।’
পরিচালকের কাছে শেষ পর্যন্ত পরিবেশের গল্পের পাশাপাশি মানুষের গল্পও সেখানে মূল। ফুয়াদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, ‘যে পৃথিবীতে একটা গাছ মানুষের পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে গাছের মরে যাওয়া মানে মানুষটারও ধীরে ধীরে মুছে যাওয়া। গাছ আমার আগের কাজেও ফিরে ফিরে এসেছে; এবার সে গাছ একটা সম্পর্কের আয়না। তূর্য আর তন্বীর ভেতর দিয়ে আমি দেখতে চেয়েছি, ভালোবাসা ঠিক কোন মুহূর্তে যত্ন থেকে জেদ হয়ে ওঠে। ধরে রাখা আর ছেড়ে দেওয়ার মাঝখানের যে সরু জায়গাটুকু, ছবিটা সেখানেই দাঁড়িয়ে।’