পিরোজপুরের জিয়ানগর উপজেলায় প্রভাবশালী প্রতিবেশীদের দ্বারা জমি দখল, মিথ্যা মামলায় হয়রানি এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে এক দিনমজুর পরিবার নিঃস্ব হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দীর্ঘ ১৫ বছরের এই নির্যাতনের ফলে ব্রেইন স্ট্রোক করে শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েছেন ভুক্তভোগী মো. শহিদুল ইসলাম। এই অন্যায়ের বিচার এবং ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
ভুক্তভোগী পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তারা পিরোজপুরের পাড়েরহাট ইউনিয়নের হোগলাবুনিয়া গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। ওয়ারিশসূত্রে প্রাপ্ত ৪০ শতাংশ এবং পূর্বপুরুষদের কেনা জমিসহ মোট ১৬৭ শতাংশ জমির মালিক ছিলেন তারা। পরবর্তীতে কিছু জমি বিক্রি ও এওজ-বদল শেষে বসতভিটাসহ ১২১ শতাংশ জমি তাদের দখলে ছিল।
অভিযোগ করা হয়েছে যে, ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী ছিলেন প্রতিবেশী মোস্তফা হাওলাদার। ২০১১ সালে তিনি ওই জমির রেকর্ড সংশোধনের মামলা করেন এবং ২০১২ সালে তৎকালীন সরকারি দল আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে জমিটি দখল করে নেন বলে দাবি করা হয়।
২০১৩ সালের ডিসেম্বরে দুর্বৃত্তদের হামলায় মোস্তফা হাওলাদার নিহত হন। এই ঘটনায় তার ভাই আবদুল মজিদ হাওলাদার বাদী হয়ে ইন্দুরকানী থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই মামলায় শহিদুল ইসলামের অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া শিশুসন্তান সোলাইমান হাওলাদারকে তিন নম্বর আসামি এবং তার ভাই আব্দুর রহিম হাওলাদারকেও আসামি করা হয়।
প্রায় এক বছর কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্ত হলেও হয়রানির কারণে সোলাইমানের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে ২৮ বছর বয়সি সোলাইমান ভাড়ায় অটোরিকশা চালিয়ে ও দিনমজুরি করে পরিবারের জীবিকা নির্বাহ করছেন। মোস্তফা হাওলাদারের মৃত্যুর পর তার ভাই রুস্তুম ও কুদ্দুস হাওলাদার জমিটি নিয়ন্ত্রণে নেন। তাদের বিরুদ্ধে জমির গাছ বিক্রি করে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা আত্মসাৎ এবং প্রতিবছর ধানি জমি লিজ দিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
ছেলেকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো এবং দফায় দফায় নির্যাতনের মানসিক ধাক্কা সামলাতে না পেরে শহিদুল ইসলাম পর পর তিনবার ব্রেইন স্ট্রোক করে শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে যান। বর্তমানে তাকে বসতভিটা থেকেও উচ্ছেদের চেষ্টা এবং মারধর করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আবেগঘন কণ্ঠে ভুক্তভোগী শহিদুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "জমির সব কাগজপত্র আমাগো আছে, কিন্তু ওরা জোর কইরা খায়। ওগো কোনো কাগজ নাই। মোর পোলাডারে মিথ্যা মামলা দিয়া পড়ালেখা শেষ কইরা দেছে। এহন মোগো ভাঙা ঘর থিকাও নামাইয়া দিতে চায়। ৬-৭ দিন আগেও মোরে আর মোর স্ত্রীরে মারছে। আমরা বিচার চাই।"
স্থানীয় বাসিন্দা ইউনুস মোল্লা ও মঈনুদ্দিন (বয়স প্রায় ৭০ বছর) জানান, তারা ছোটবেলা থেকেই জানেন যে এই বসতভিটা ও জমি প্রতিবন্ধী শহিদুলের বাবার। তাদের দাবি, মোস্তফা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এবং সাঈদী হুজুরের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেওয়ার সুযোগ নিয়ে জমিটি দখল করেছিলেন, যা এখন তার ভাইয়েরা ভোগদখল করছেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত কুদ্দুস হাওলাদার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, "আমরা কোনো হামলা বা মারধরের ঘটনা ঘটাইনি। বরং তারাই আমাদের জমির গাছ কেটে নিয়ে গেছে। আদালত যে রায় দেবে, আমরা তা মেনে নেব।"
ইন্দুরকানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহব্বত খান মুক্তকণ্ঠকে জানান, উভয় পক্ষের থেকে পৃথক লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়গুলোর কিছু অংশ দেওয়ানি মামলার আওতাভুক্ত হলেও কিছু ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত। সার্বিক ঘটনা তদন্ত করে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার অপব্যবহারের নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছে এলাকার সচেতন মহল।