ফরিদপুরের সরকারি শিশু পরিবারের (বালিকা) এক কিশোরীর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনে ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়কসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা, উদাসীনতা ও সীমাহীন অবহেলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত কমিটির একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিবেদনের বিস্তারিত মুক্তকণ্ঠের কাছে তুলে ধরেন। ওই সদস্য বলেন, শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়কের যে দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল ভূমিকা পালন করার কথা, তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আয়া, প্রহরীসহ অন্য কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের দায়িত্বহীনতা ও কেবল চাকরি করার মানসিকতার প্রতিফলন দেখা গেছে।
.দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়কসহ ছয় কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশসহ তদন্ত প্রতিবেদন সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়েছে।মো. মাজহারুল ইসলাম, জেলা প্রশাসক, ফরিদপুর
তদন্ত প্রতিবেদনটি গত ২৯ জুলাই পেয়েছেন জানিয়ে মুক্তকণ্ঠকে জেলা প্রশাসক মো. মাজহারুল ইসলাম বলেন, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়কসহ ছয় কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশসহ তদন্ত প্রতিবেদন সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো হয়েছে।
সাময়িক বরখাস্ত হওয়া ছয়জন হলেন সহকারী পরিচালক ও শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আরিফ হোসেন, তত্ত্বাবধায়ক মো. হাবিবুর রহমান, কম্পিউটার অপারেটর আবীর দাস, মেট্রন-কাম-নার্স মনি আক্তার এবং আয়া শামসুন্নাহার আক্তার ও তানিয়া তাজরীন।
.তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে তদন্ত কমিটির এক সদস্য জানান, ওই শিশুনিবাসের কিশোরীদের একটি বড় অংশ বেপরোয়া মানসিকতার (ডেসপারেট), তাদের নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কর্তৃপক্ষ দেখাতে পারেনি। কিশোরীদের এক বা দুজন কিংবা দলবদ্ধ হয়ে বের হয়ে যাওয়া এবং গভীর রাত করে ফেরার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। নিবাসীরা যেসব বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে, সে বিদ্যালয় থেকে নিয়মিত ক্লাস না করার বিষয়ে বারবার তত্ত্ববধায়ককে জানানো হলেও এ ব্যাপারে কোনো ফলপ্রসূ উদ্যোগ নিতে দেখা যায়নি।
ওই কর্মকর্তা জানান, একটি কিশোরী অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ছয় মাস পর জানার বিষয়টিকে কর্তৃপক্ষের সীমাহীন গাফিলতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে ভুক্তভোগী কিশোরীর পারিবারিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ওই কিশোরী অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল পরিবারে বড় হয়েছে, মায়ের মৃত্যুর পর সৎমায়ের সংসারে ছিল। এর ফলে সে ভিন্ন মানসিক অবস্থা নিয়ে বড় হয়েছে।
তদন্ত কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, সহানুভূতি ও ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা ওই কিশোরীকে ভুল সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে। এ ছাড়া অভিযুক্ত দরজি ব্যবসায়ীর ‘বিকৃত রুচি’ও ঘটনার আরেকটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
.গত ৫ জুলাই ফরিদপুর শহরের টেপাখোলা মহল্লায় অবস্থিত সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা)–এর এক কিশোরীর ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার খবর জানাজানি হয়। পরদিন নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করেন শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আরিফ হোসেন।
ঘটনা তদন্তে ৭ জুলাই জেলা প্রশাসক মো. মাজহারুল ইসলাম চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সুস্মিতা সাহা। সদস্যসচিব করা হয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সহকারী কমিশনার জান্নাতুল সুলতানাকে। অন্য দুই সদস্য ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. আজমীর হোসেন এবং সিভিল সার্জনের প্রতিনিধি চিকিৎসা কর্মকর্তা নূপুর পাল। ১৩ জুলাই থেকে কমিটি তদন্তকাজ শুরু করে।
তদন্ত শেষে কমিটি শিশু পরিবারের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে একজন নারী কর্মকর্তাকে নিয়োগের সুপারিশ করেছে। সেই সঙ্গে মাসে অন্তত একবার নিবাসীদের স্বাস্থ্যপরীক্ষা নিশ্চিত করা, প্রতিষ্ঠানে আগত দর্শনার্থী ও অন্যান্য ব্যক্তির তথ্য নিয়মিত সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং দায়িত্বে অবহেলার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।
.তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক সুস্মিতা সাহা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তদন্তের অভিজ্ঞতা থেকে তাঁদের মনে হয়েছে, বালিকাদের এই প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বে একজন নারী থাকলে তা অধিক উপযোগী হবে। পাশাপাশি নিবাসীদের নিয়মিত শারীরিক পরীক্ষা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।